“যৌন সম্পর্ক ও লালা থেকেও ছড়ানোর আশঙ্কা!”-‘হান্টা ভাইরাসের আয়ু কতদিন? বড় গবেষণায় বিজ্ঞানীরা

করোনা অতিমারির ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। তার মধ্যেই বিশ্বজুড়ে নতুন আতঙ্ক ছড়াচ্ছে মারাত্মক ‘অ্যান্ডিজ হান্টাভাইরাস’ (Andes Hantavirus)। মাঝসমুদ্রে একটি বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজে এই ভাইরাসের কামড়ে ৩ জনের মৃত্যুর পর থেকেই কার্যত ঘুম উড়েছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা মহলের। ভাইরাসটি কতটা বিপজ্জনক, মানুষের শরীরে এটি কতদিন সক্রিয় থাকে এবং কতদিন পর্যন্ত অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে— এই মুহূর্তে এমন একাধিক জরুরি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন দুনিয়ার তাবড় বিজ্ঞানীরা। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে ইতিমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই ভাইরাসের চরিত্র বুঝতে উচ্চপর্যায়ের গবেষণা শুরু করেছে।

কেন সাধারণ হান্টাভাইরাসের থেকে এটি বেশি উদ্বেগজনক?

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্ডিজ হান্টাভাইরাস অন্য পাঁচটা সাধারণ ভাইরাসের মতো নয়। সাধারণ হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুর বা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। কিন্তু অ্যান্ডিজ হান্টাভাইরাসের চরিত্র আরও অনেক বেশি জটিল ও সংক্রামক। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এটি মানুষের শরীরের বিভিন্ন তরলের (Body Fluids) মাধ্যমেও অনায়াসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। লালা, স্তন্যদানকারী মায়ের বুকের দুধ এমনকি পুরুষের শুক্রাণুর মাধ্যমেও এই ভাইরাস একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

কেন বাড়ছ উদ্বেগ?

সম্প্রতি ‘এমভি হন্ডিয়াস’ (MV Hondius) নামে একটি ক্রুজ জাহাজে এই ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর থেকেই বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কারণ, মানুষের শরীরের তরল থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর অর্থ হলো— ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ বা অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের মাধ্যমেও এই ভাইরাস মহামারি আকার নিতে পারে। তবে বিজ্ঞানীদের সবথেকে বেশি যেটা ভাবাচ্ছে তা হলো, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ঠিক কতদিন পর্যন্ত অন্যকে সংক্রমিত করার ক্ষমতা রাখেন, সেই বিষয়ে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য হাতে নেই।

এই বিষয়ে ডব্লিউএইচও (WHO)-র ইমার্জিং ডিজিজেস অ্যান্ড জুনোসিস ইউনিটের প্রধান মারিয়া ভ্যান কেরখোভে জানিয়েছেন, এই ভাইরাসটির নিখুঁত চরিত্র বুঝতে একাধিক গবেষণা চালানো হচ্ছে। তার মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি স্টাডি’ (Natural History Study)। এই বিশেষ গবেষণার মাধ্যমেই মানুষের শরীরে ভাইরাসের সম্পূর্ণ জীবনচক্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কীভাবে চলছে গবেষণা?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, এই মুহূর্তে যারা কোয়ারেন্টাইনে (Quarantine) রয়েছেন, তাদের ওপর কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। তাদের শরীর থেকে নিয়মিত রক্ত, লালা, শুক্রাণুসহ বিভিন্ন তরলের নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ল্যাবরেটরিতে এই সমস্ত নমুনা পরীক্ষা করে দেখার মূল উদ্দেশ্য হলো, একজন রোগী আপাতভাবে সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরও তাঁর শরীরে ভাইরাসটি লুকিয়ে রয়েছে কি না এবং তাঁর থেকে নতুন করে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা।

চিকিৎসকদের মতে, এই গবেষণার ফলাফল হাতে আসা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, বর্তমানে হান্টাভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মূলত অক্সিজেন থেরাপি, কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যবস্থা, ব্যথানাশক এবং ফুসফুসের বিশেষ যত্ন নেওয়ার মতো সহায়ক চিকিৎসার (Supportive Care) মাধ্যমেই সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ক্রুজ জাহাজে ঠিক কী ঘটেছিল?

গত এপ্রিল মাসে মাঝসমুদ্রে ‘এমভি হন্ডিয়াস’ ক্রুজ জাহাজের ভেতরে আচমকাই থাবা বসায় এই অ্যান্ডিজ হান্টাভাইরাস। চোখের পলকে যাত্রী এবং জাহাজের কর্মীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। একে একে আক্রান্ত হন ১১ জন, যার মধ্যে ৩ জনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর থেকেই আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলকারী সমস্ত ক্রুজ জাহাজের যাত্রী ও পর্যটকদের ওপর বিশেষ নজরদারি ও থার্মাল স্ক্রিনিং শুরু করেছে বিভিন্ন দেশ।

বিজ্ঞানীদের বড় ভয় এখানেই যে, যদি এই ভাইরাস সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরও মানুষের শরীরে দীর্ঘ সময় ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকার ক্ষমতা রাখে, তবে অজান্তেই তা বিশ্বজুড়ে সুপার-স্প্রেডারের ভূমিকা নিতে পারে।

ভবিষ্যতে কী ধরনের নিয়ম আসতে পারে?

হু (WHO)-এর ইঙ্গিত, আগামী কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যেই এই চলমান গবেষণার প্রথম রিপোর্ট সামনে আসতে পারে। আর সেই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বজুড়ে নতুন গাইডলাইন বা নির্দেশিকা জারি করা হবে।

সেক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কতদিন আইসোলেশনে রাখা দরকার, তা যেমন স্পষ্ট হবে, তেমনই পুরুষদের ক্ষেত্রে যৌন সম্পর্কের সময় বিশেষ সতর্কতা (যেমন কন্ডোম ব্যবহার), স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য আলাদা স্বাস্থ্যবিধি এবং ঘনিষ্ঠ মেলামেশার ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ আসতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।