মরা মানুষ ফিরছে বাড়ি! আয়ুষ্মান ভারতের আজব ভুলেই ছত্তীসগড়ে তোলপাড়, কাঠগড়ায় হাসপাতাল

মৃতের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে এক মাস পেরিয়ে গিয়েছে, হাতে রয়েছে সরকারি মৃত্যুর শংসাপত্রও। অথচ এর ঠিক ৪২ দিন পরে মৃত পুলিশকর্মীর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে এসে পৌঁছাল সরকারি স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের এক অদ্ভুত বার্তা—তিনি নাকি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরছেন! ছত্তীসগড় রাজ্যের এই অবিশ্বাস্য এবং চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই গোটা দেশজুড়ে স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের অনলাইন তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সরকারি হাসপাতালের ভূমিকা নিয়ে অত্যন্ত জোরালো প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

মৃত পুলিশ কনস্টেবলের নাম দেবনারায়ণ রাম। গত ২৬ জুন অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় ছত্তীসগড়ের সুরগুজার অম্বিকাপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে ‘আয়ুষ্মান ভারত–প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা’ বা এপিজেওয়াই প্রকল্পের অধীনে তাঁর চিকিৎসা চলছে বলে নথিপত্র তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ভর্তির মাত্র চার দিনের মাথাতেই অর্থাৎ গত ৩০ জুন চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই হাসপাতালে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় দেবনারায়ণের। পরিবারের পক্ষ থেকে সমস্ত ধর্মীয় নিয়ম মেনে তাঁর শেষকৃত্যের কাজও সম্পন্ন করা হয়।

কিন্তু আসল বিপত্তি ঘটে ঠিক ৪২ দিন পর। মৃত দেবনারায়ণের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে ‘আয়ুষ্মান সারথি’র পক্ষ থেকে একটি সরকারি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা এসে ঢোকে। সেই অবাক করা বার্তায় লেখা ছিল, “প্রিয় দেবনারায়ণ রাম, আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন জেনে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। আয়ুষ্মান ভারত–প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনার অধীনে চিকিৎসা পরিষেবা পেয়ে আপনি সন্তুষ্ট হয়েছেন বলে আমরা আশা করি।” এই মেসেজ দেখার পরেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মৃতের পরিবার।

মৃত কনস্টেবলের স্ত্রী সীমা কুজুর সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, এক জন মৃত মানুষের নামে কীভাবে এ ধরনের অবাস্তব বার্তা পাঠানো হতে পারে? তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে জানান, “আমার স্বামী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গিয়েছেন। আমরা যথাযথভাবে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছি। অথচ ৪২ দিন পরে সরকারি বার্তা আসছে যে তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন! এত বড় প্রযুক্তিগত ভুল এবং গাফিলতি কীভাবে হতে পারে? আমি এর উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।”

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, সীমা নিজে একজন হাসপাতালের কর্মী। তাঁর জোরালো দাবি, স্বামীর মৃত্যুর পরে সমস্ত আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সঠিক সময়ে সম্পূর্ণ করা হয়েছিল এবং হাসপাতাল থেকে মৃত্যুর শংসাপত্রও হাতে দেওয়া হয়েছিল। তা সত্ত্বেও আয়ুষ্মান ভারতের ডিজিটাল নথিতে তাঁকে চিকিৎসাধীন বা সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া রোগী হিসেবে দেখানো হয়েছে। সীমা আরও বলেন, “আমি নিজেই হাসপাতালের কর্মী হওয়া সত্ত্বেও যদি আমার সঙ্গে এমন জঘন্য ঘটনা ঘটতে পারে, তা হলে সাধারণ মানুষ এবং দরিদ্র আদিবাসী পরিবারগুলির সঙ্গে কী ধরনের চরম হয়রানি হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।” ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি দোষী কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছেন।

এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই প্রশ্ন উঠেছে যে, রোগীর মৃত্যুর সঠিক তথ্য কি সময়মতো আয়ুষ্মান ভারতের পোর্টালের সিস্টেমে আপডেট করা হয়নি? পাশাপাশি, মৃত্যুর পরেও তাঁর কার্ডের অপব্যবহার করে অতিরিক্ত কোনো অর্থ দাবি বা আত্মসাৎ করা হয়েছিল কি না, সেই গুরুতর সন্দেহও প্রকাশ করেছে শোকস্তব্ধ পরিবার।

যদিও এই অভিযোগের জবাবে সমস্তরকম আর্থিক দুর্নীতির কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক শৈলেন্দ্র গুপ্ত সাফাই দিয়ে জানান যে, দেবনারায়ণ ২৬ জুন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং ৩০ জুন তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। আয়ুষ্মান প্রকল্প থেকে শুধুমাত্র ওই চার দিনের প্রকৃত চিকিৎসার বিলের টাকাই দাবি করা হয়েছে। মৃত্যুর পরবর্তী ৪২ দিনের জন্য অতিরিক্ত কোনো অর্থ দাবি বা তোলা হয়নি। হাসপাতালের আরও দাবি, দেবনারায়ণের মৃত্যুর পরেই আয়ুষ্মান সংক্রান্ত রেকর্ড বন্ধ করে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তথ্য নথিভুক্ত করার দায়িত্বে থাকা ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের মারাত্মক গাফিলতির কারণেই তা সময়মতো আপডেট করা হয়নি। অভিযুক্ত কর্মীকে ইতিমধ্যেই আয়ুষ্মান কার্ডের কাজ থেকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

তবে হাসপাতালের এই সাফাইয়ে বিন্দুমাত্র সন্তুষ্ট নয় মৃত পুলিশকর্মীর পরিবার। তাদের সোজা সাপ্টা প্রশ্ন, চিকিৎসার টাকা অতিরিক্ত না নেওয়া হলেও একজন মানুষের মৃত্যুর ৪২ দিন পর পর্যন্ত কেন তাঁর ডিজিটাল নথি সংশোধন করা হলো না? প্রশাসনিক এই চরম গাফিলতিকে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি করার মতো একটি গুরুতর অপরাধ বলে দাবি করে পূর্ণাঙ্গ বিচার চেয়েছেন দেবনারায়ণের স্ত্রী।