থ্রি-স্টার হোটেলের ভাড়ায় মিলবে কর্পোরেট হাসপাতালের বেড! চিকিৎসা খরচ কমাতে ঐতিহাসিক সুপারিশ সংসদীয় কমিটির

দেশের প্রথমসারির হাসপাতালগুলিতে আকাশছোঁয়া চিকিৎসা খরচ এবং লাগামছাড়া বেড ভাড়ার ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আনতে এবার অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ করার সুপারিশ করল সংসদীয় কমিটি। কর্পোরেট হাসপাতালগুলির বেড ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে আশপাশের থ্রি-স্টার হোটেলের ঘর ভাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার এক চাঞ্চল্যকর প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় সাধ্যের মধ্যে আনতে এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ফেরাতে এই সুপারিশ ঘিরে গোটা দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
সংসদের ওই কমিটির পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রককে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার ক্ষেত্রে অবিলম্বে একটি নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট প্রটোকল বা চিকিৎসা সংক্রান্ত আদর্শ নির্দেশিকা তৈরি করতে হবে। কমিটির জোরালো বক্তব্য, যে সমস্ত চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রচুর পরিমাণে অর্থ ব্যয় হয়, সেই সমস্ত ক্ষেত্রে প্রতিটি হাসপাতালে রোগীর পরিবারকে চিকিৎসার আনুমানিক খরচের বিষয়ে আগাম বিস্তারিত জানাতে হবে। পাশাপাশি, আর্থিক ও মানসিক পরামর্শ দেওয়ার জন্য অভিজ্ঞ পেশাদার বিশেষজ্ঞ রাখার ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রক কমিটিকে জানিয়েছে যে ইতিমধ্যেই কুড়িটি বিশেষ রোগের ক্ষেত্রে এই প্রটোকল চালু করা হয়েছে, তবে কমিটি প্রতিটি হাসপাতালে এই নিয়ম কড়াভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা করার তাগিদ দিয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলি চূড়ান্ত করার আগে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মতামত চাওয়া হয়েছিল, যেখানে গত তিন বছরে হাসপাতালে চিকিৎসার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন প্রায় ২৩ হাজার মানুষ তাদের মতামত ও অভিজ্ঞতা সরাসরি কমিটিকে জানিয়েছেন।
তবে সংসদীয় কমিটির এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে প্রশ্ন তুলেছে হাসপাতাল ও চিকিৎসক মহল। তাদের জোরালো বক্তব্য, হাসপাতালের একটি বেডকে নিছকই একজন রোগীর শুয়ে থাকার সাধারণ ঘর বলে মনে করা এক বিরাট ভুল। একটি হাসপাতালের বেডের সঙ্গে বহুমূল্য আধুনিক জীবনদায়ী যন্ত্রপাতি, ২৪ ঘণ্টা নজরদারির জন্য দক্ষ নার্স এবং চিকিৎসা কর্মীরা যুক্ত থাকেন। এছাড়াও, কর্পোরেট হাসপাতালে দিনে অন্তত চারবার চিকিৎসকরা রোগীকে ব্যক্তিগতভাবে পরীক্ষা করেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই বেড ভাড়ার সঙ্গে জরুরি কিছু প্রাথমিক পরীক্ষার খরচও অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে থ্রি-স্টার হোটেলের রুমের সঙ্গে হাসপাতালের বেডের তুলনা টানাকে পুরোপুরি অবাস্তব ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছেন চিকিৎসকরা।
এই প্রসঙ্গে দেশের ২০ হাজারেরও বেশি হাসপাতালের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথকেয়ার প্রোভাইডারস অফ ইন্ডিয়া’ (AHPI)-এর নির্বাহী পরিচালক গিরধর জ্ঞানী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, হাসপাতালের রুম কেবল একটি সাধারণ থাকার জায়গা নয়, এর সঙ্গে নার্সিং কেয়ার, সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের মতো অতি জরুরি পরিষেবা যুক্ত থাকে। থ্রি-স্টার হোটেলের মানদণ্ড চাপিয়ে না দিয়ে হাসপাতালের ভাড়া নির্ধারণের প্রক্রিয়াটিকে স্বচ্ছভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। অন্যদিকে, রোগীর অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী মহল মনে করছে যে বেড ভাড়ার ওপর মূল্যসীমা চাপানোর চেয়ে চিকিৎসা সংক্রান্ত আদর্শ নির্দেশিকা বা এসটিজি কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক করাটা অনেক বেশি জরুরি। ‘জন স্বাস্থ্য অভিযান’-এর সদস্য তথা প্রখ্যাত চিকিৎসক অরুণ গাদরে জানিয়েছেন যে এই পদক্ষেপ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। সবমিলিয়ে, চিকিৎসা খরচ নিয়ন্ত্রণের এই মহা বিতর্কে আগামী দিনে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় বড় ধরনের আইনি বদল আসার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।