জ্বলছে দেশ! তাপপ্রবাহকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করল কেন্দ্র, মিলবে আর্থিক ক্ষতিপূরণ

ভারতের ওপর জাঁকিয়ে বসা তীব্র তাপপ্রবাহ এবং দেশজুড়ে বজ্রপাতের ভয়াবহ প্রকোপের কথা মাথায় রেখে এবার বড় ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ করল কেন্দ্রীয় সরকার। দেশজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ (National Disaster) হিসেবে ঘোষণা করা হলো। সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের পক্ষ থেকে এই মর্মে একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDMA)-র বিভাগীয় প্রধান কৃষ্ণ এস ভাটসা এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের নেপথ্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানিয়েছেন যে, বর্তমান সময়ে লাগাতার তাপপ্রবাহ একটি অত্যন্ত মারাত্মক ও প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। তাই সরকারের প্রতিটি স্তরে এর দীর্ঘমেয়াদী মোকাবিলা এবং পর্যাপ্ত সম্পদের জোগান নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
এই নতুন ও যুগান্তকারী ঘোষণার ফলে দেশের বিভিন্ন রাজ্য সরকারগুলির হাত যথেষ্ট শক্ত হলো। এখন থেকে রাজ্যগুলি বজ্রপাত ও তাপপ্রবাহ—উভয় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং তার প্রভাব প্রশমনের জন্য ‘স্টেট ডিজাস্টার রেসপন্স ফান্ড’ (SDRF) এবং ‘স্টেট ডিজাস্টার মিটিগেশন ফান্ড’ (SDMF)-এর বিপুল অর্থ অবাধে খরচ করতে পারবে। সাম্প্রতিক অতীতে এই দুর্যোগগুলির তীব্রতা ও ভয়াবহতা যেভাবে লাগাতার বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে সরকারের সমস্ত বিভাগকে সজাগ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর গ্রীষ্মের মরসুমে তীব্র তাপপ্রবাহের কবলে পড়ে ভারতে হাজার হাজার মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। মৃতদের একটা বড় অংশই সমাজের অত্যন্ত প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষ, যাদের কড়া রোদ ও তাপপ্রবাহ থেকে নিজেদের রক্ষা করার মতো কোনো পাকা ঘরবাড়ি বা সুব্যবস্থা নেই। জাতীয় দুর্যোগের তকমা পাওয়ায় এখন থেকে তীব্র তাপপ্রবাহের সময়ে রাজ্য প্রশাসন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে গৃহহীন ও দিনমজুর মানুষদের সাময়িকভাবে নিরাপদ ত্রাণ শিবিরে স্থানান্তরিত করতে পারবে। শুধু তাই নয়, এর ফলে তাপপ্রবাহে মৃতদের পরিবারগুলিকে নিয়মমাফিক আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পথও পরিষ্কার হলো।
সরকারের এই নতুন আর্থিক সিদ্ধান্ত কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে আলোকপাত করে কৃষ্ণ এস ভাটসা জানান যে, কেন্দ্র সরকারের দেওয়া এই অর্থ মূলত ‘সিড মানি’ (Seed money) বা প্রাথমিক পুঁজি হিসেবে কাজ করবে। এই নির্দিষ্ট খাতে বরাদ্দ করা অর্থ দিয়ে দেশের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে ‘হিট অ্যাকশন প্ল্যান’ (HAP) বা তাপজনিত দুর্যোগ মোকাবিলা পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হবে। এর ফলে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি বা CSR ফান্ড এবং অন্যান্য সরকারি প্রকল্প থেকে অতিরিক্ত তহবিল সংগ্রহ করা অনেকটাই সহজ হয়ে উঠবে। কোনো পুরসভা বা নগরোন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যদি তীব্র দাবদাহ থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে ‘কুলিং শেল্টার’ বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করতে চায়, পানীয় জলের উৎসের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে চায় কিংবা জনবহুল এলাকায় আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায়, তবে এই তহবিল থেকে সেই সমস্ত মহৎ উদ্যোগে অর্থ বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে।
এই সামগ্রিক পরিকল্পনা সফলভাবে রূপায়ণ করার জন্য স্থানীয় স্তরে জেলা প্রশাসন ও পুর কর্পোরেশনগুলিকে প্রধান দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক মডেল অনুসরণ করে দেশের বিভিন্ন শহরে ‘হিট অফিসার’ নিয়োগের মতো অভিনব ভাবনার কথাও উঠে এসেছে, যাঁরা শহরের তাপমাত্রা কমাতে বৃক্ষরোপণ, সবুজায়ন এবং পরিবেশবান্ধব বাড়ির নকশা তৈরির মতো জরুরি বিষয়গুলি তদারকি করবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রের এই দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ আগামী দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব মোকাবিলা করতে এবং সাধারণ মানুষের প্রাণ রক্ষা করতে এক বিরাট ভূমিকা পালন করবে।