বিধাননগরের প্রাক্তন বিধায়ক এবং তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতা সব্যসাচী দত্তের গ্রেফতারি ঘিরে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। ব্যবসায়ী মধুসূদন চক্রবর্তীর দায়ের করা তোলাবাজির মামলায় সোমবার রাত ১টা নাগাদ তাঁকে গ্রেফতার করে বিধাননগর উত্তর থানার পুলিশ। এই ঘটনার পর থেকেই যেন প্যান্ডোরার বাক্স খুলে গিয়েছে, একের পর এক চাঞ্চল্যকর অডিও ও ভিডিও ফুটেজ সামনে আনছেন অভিযোগকারী ব্যবসায়ী।
‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিছু করতে পারবেন না!’
অভিযোগকারী ব্যবসায়ী মধুসূদন চক্রবর্তীর দাবি, সব্যসাচী দত্তের ক্ষমতার দম্ভ ছিল সীমাহীন। তিনি যখন রাজারহাট-নিউটাউনের বিধায়ক এবং বিধাননগরের মেয়র ছিলেন, তখন সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। ব্যবসায়ীকে সব্যসাচী বলেছিলেন, “মুখ্যমন্ত্রী আপনাকে কিছু করতে পারবেন না, এখানে আমিই শেষ কথা।” এই দম্ভের কারণেই দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ব্যবসায়ীদের ওপর জুলুম চালিয়েছেন বলে অভিযোগ।
ভাইরাল অডিও ও ভিডিওর পর্দাফাঁস
পুলিশ সূত্রে খবর, সোমবার সন্ধ্যায় সব্যসাচীর রাজারহাটের ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালায় পুলিশ। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এরই মধ্যে ব্যবসায়ীর শেয়ার করা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালে সব্যসাচীর ঘনিষ্ঠ প্রতিনিধি বিমল গাঙ্গুলি তাঁর অফিস থেকে আড়াই লক্ষ টাকা ঘুষ নিচ্ছেন। অভিযোগ, সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে এই লেনদেন। এছাড়া সব্যসাচীর সঙ্গে ব্যবসায়ীর কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়েছে। অডিওতে শোনা যাচ্ছে, সব্যসাচী তারিখ উল্লেখ করে তাগাদা দিচ্ছেন যেন ১২ তারিখের মধ্যে টাকা না মেটানো হয়। উত্তরে ব্যবসায়ীকে বলতে শোনা যাচ্ছে, “দাদা, আমি সোনা-দানা বেচে ১ কোটি টাকার ব্যবস্থা করেছি।”
প্রতিদিনের জুলুমের রাজত্ব
ব্যবসায়ী মধুসূদন চক্রবর্তীর অভিযোগ, সব্যসাচী দত্তর জুলুম ছিল সর্বব্যাপী। বাড়ি তৈরি, ভাঙা, কেনা কিংবা বিক্রি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই লাগত মোটা অঙ্কের ‘তোলা’। টাকা দিতে অস্বীকার করলে জুটত মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি। সব্যসাচীর মতো একজন জনপ্রতিনিধি যখন প্রকাশ্যেই তোলাবাজি চালাতেন, তখন ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি।
মঙ্গলবার সব্যসাচীকে আদালত থেকে বের করার সময় জনরোষের সাক্ষী থাকল এলাকা। তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম, পচা কলা ছুড়লেন স্থানীয় মানুষ। বিক্ষুব্ধ জনতার মন্তব্য, “ক্ষমতায় থাকাকালীন সাধারণ মানুষকে মানুষ বলে মনে করতেন না তিনি।” সব্যসাচীর বিরুদ্ধে একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করেছে পুলিশ। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এই গ্রেফতারি তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরেও বড়সড় নাড়িয়ে দিয়েছে। সব্যসাচী দত্তর এই ‘তোলাবাজি সাম্রাজ্য’-এর শেষ কোথায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।





