মমতার ‘বটগাছ’ থেকে শাহের ‘পা ছুঁয়ে প্রণাম’—কীভাবে বাংলার মসনদে বসলেন সেই দিনের ‘বিদ্রোহী’ শুভেন্দু?

রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু হয় না—এই বহুচর্চিত প্রবাদটিই যেন আজ পশ্চিমবঙ্গের ধুলোবালিতে ধ্রুবসত্য হয়ে ধরা দিল। সালটা ২০২০, অক্টোবর মাস। এক প্রবল ঝড়ের পূর্বাভাস পাচ্ছিল বাংলার রাজনৈতিক মহল। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একচ্ছত্র দাপট, অন্যদিকে তাঁরই ছায়াসঙ্গী তথা নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অন্যতম সেনাপতি শুভেন্দু অধিকারীর অন্দরে জমতে থাকা ক্ষোভ। সেই দহনদিনগুলিই আজ শুভেন্দু অধিকারীকে বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রাজভবনের শপথ মঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছে দিল।
অভিষেকের উত্থান ও সংঘাতের সূত্রপাত
২০২০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই তৃণমূলের অন্দরে সমীকরণ বদলাতে শুরু করে। দলের সাংগঠনিক ব্যাটন যখন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে উঠতে শুরু করল, তখনই তৈরি হয় ফাটল। শুভেন্দু, যিনি ২০০৭ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাইটার্স বিল্ডিংসের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন, তিনি কোনোভাবেই এই ‘ভাইপো-রাজ’ মেনে নিতে পারছিলেন না। অক্টোবরেই প্রকাশ্যে আসে ‘অভিষেক বনাম শুভেন্দু’ সংঘাত।
তৃণমূলের জনসভা থেকে ধীরে ধীরে উধাও হতে শুরু করে মমতার ছবি। স্লোগান থেকে বাদ পড়ে দলের নাম। স্বামী বিবেকানন্দের উদ্ধৃতি টেনে শুভেন্দু তখন হুঙ্কার দিয়েছিলেন, “আমি, আমার এইসব নীতি দিয়ে জগৎ পরিবর্তন করা যায় না।”
পদত্যাগ ও সেই নাটকীয় ডিসেম্বরের রাত
২৬ নভেম্বর ২০২০; হুগলি নদী সেতু কমিশনের চেয়ারম্যান পদ ছাড়েন তিনি। তার ঠিক পরের দিনই মমতা মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা। সৌগত রায় ও ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর (পিকে) একাধিকবার দূত হিসেবে শুভেন্দুর মান ভাঙাতে গেলেও তিনি ছিলেন অনড়। ডিসেম্বরের শুরুতেই একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় শুভেন্দু জানিয়ে দেন— “একসঙ্গে কাজ করা আর সম্ভব নয়।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন এক জনসভায় দলের এই ক্ষোভকে গুরুত্ব না দিয়ে বলেছিলেন, “তৃণমূল একটা বটগাছ। দু-তিনজন চলে গেলে কিচ্ছু যায় আসে না।” শুভেন্দুকে ‘চম্বলের দস্যু’ এবং ‘বহিরাগতদের’ সঙ্গী হিসেবেও কটাক্ষ করেছিলেন তিনি।
মেদিনীপুরের কলেজ মাঠ থেকে বিজেপির রথচালক
২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর দিনটি বাংলার ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে গেল। অমিত শাহের হাত থেকে গেরুয়া পতাকা তুলে নিয়ে শুভেন্দু মেদিনীপুরের মাটিতে ঘোষণা করেছিলেন পরিবর্তনের নতুন লড়াই। শাহের পা ছুঁয়ে প্রণাম করার সেই ছবি ছিল আসলে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক যুদ্ধের শুরু।
সেই থেকে গত কয়েক বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম, সংগঠন গোছানো এবং ভোটারদের নাড়ির স্পন্দন বুঝে রণকৌশল সাজানো— শুভেন্দু নিজেকে প্রমাণ করেছেন প্রতি পদে। যে নেতাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সৈনিক মনে করতেন, আজ সেই শুভেন্দু অধিকারীই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম খোদাই করে নিলেন।