কলকাতার ইতিহাসের প্রতিটি ইঁট-পাথরের সঙ্গে যার অস্তিত্ব মিশে আছে, সেই ঐতিহাসিক লালবাড়ি বা রাইটার্স বিল্ডিং দীর্ঘ এক দশকের বনবাস কাটিয়ে ফের স্বমহিমায় ফিরছে। ১৬৯০ সালে জব চার্নকের হাত ধরে আধুনিক কলকাতার যে পত্তন হয়েছিল, তার শাসনব্যবস্থার ভরকেন্দ্র ছিল এই মহাকরণ। ৩৩৬ বছরের পুরনো এই শহরের অলিতে-গলিতে লুকিয়ে আছে সহস্র ইতিহাস। তবে শুধু ঔপনিবেশিক আমল নয়, আধুনিক গবেষণায় এই জনপদ আরও প্রাচীন বলেই প্রমাণিত। আর সেই প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মহাকরণ এবার সাক্ষী হতে চলেছে এক বড়সড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের।
বাম জমানা থেকে নীল-সাদা বিপ্লব, আর অতঃপর গেরুয়া সফর—শতবর্ষের বেশি সময় ধরে বাংলার রাজনীতির স্নায়ুকেন্দ্র ছিল বিবাদি বাগের এই লালবাড়ি। কিন্তু ২০১১ সালে ক্ষমতার পালাবদলের পর আকস্মিকভাবেই প্রশাসনিক সদর দফতর স্থানান্তরিত হয় হাওড়ার নবান্নে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, মহাকরণের সংস্কারের প্রয়োজনে এই বদল। কিন্তু সংস্কার চললেও শেষ পর্যন্ত ‘নীলবাড়ি’ বা নবান্নই হয়ে উঠেছিল রাজ্যের ক্ষমতার অলিখিত উৎস। দীর্ঘ ১৫ বছর পর রাজ্যে ফের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই বিজেপি নেতৃত্ব স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বাংলার ক্ষমতার আসল কেন্দ্র হবে সেই চেনা রাইটার্স বিল্ডিং।
ক্ষমতা দখলের পর থেকেই লাল দুর্গে গেরুয়া যুগের সূচনা করতে তৎপর নতুন সরকার। সূত্রের খবর, শপথ গ্রহণের আগে পর্যন্ত মহাকরণে ছিল চূড়ান্ত ব্যস্ততা। কয়েকদিন ধরেই পূর্ত দফতরের ইঞ্জিনিয়ার ও উচ্চপদস্থ কর্তারা রাইটার্স বিল্ডিং পরিদর্শন করেছেন। সংস্কার কাজ যা এতদিন শম্বুক গতিতে চলছিল, তা এখন ‘ঝড়ের বেগে’ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যশৈলী বজায় রেখেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করা হচ্ছে এই অট্টালিকায়। ১৫ বছরের বেশি সময় কার্যত বন্ধ অবস্থায় পড়ে থাকার পর ফের জনমানসে ফিরছে পরিচিত মহাকরণ।
মহাকরণ মানেই বাঙালির কাছে একরাশ নস্ট্যালজিয়া। ২০১১ সালে দীর্ঘ বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যখন ভারী মনে সিঁড়ি দিয়ে নেমে পদত্যাগ করতে বেরিয়েছিলেন, সেই দৃশ্য আজও অনেকের স্মৃতিতে টাটকা। তারপর থেকেই রাইটার্স ব্রাত্য হতে শুরু করে। জনহীন অলিন্দ, ধুলো জমা ফাইল আর নিস্তব্ধতায় ঘেরা এই বিশাল অট্টালিকাকে নিয়ে ছড়িয়েছিল নানা গল্প। প্রশাসনিক ব্যস্ততা হারিয়ে যাওয়ায় অনেকেই একে উপহাস করে ‘ভুতুড়ে বাড়ি’ বলতে শুরু করেছিলেন।
তবে দিন ফিরছে। ইতিহাসের চলমান দলিল এই রাইটার্স। যে অলিন্দে বিনয়-বাদল-দীনেশের বীরত্বগাথা মিশে আছে, সেখানেই এবার শুরু হতে চলেছে এক নতুন প্রশাসনিক অধ্যায়। নবান্নের দিক থেকে নজর সরিয়ে ফের প্রশাসনিক ব্যস্ততা ফিরতে চলেছে গঙ্গার এপাড়ে। লালদীঘির জলে আবারও প্রতিফলিত হতে চলেছে ক্ষমতার আসল জৌলুস।





