বাংলার মসনদ হাতছাড়া হতেই কি এবার আড়াআড়ি ভাঙনের মুখে তৃণমূল কংগ্রেস? ফল প্রকাশের পর ২৪ ঘণ্টাও কাটেনি, তার মধ্যেই দলের অন্দরে জমে থাকা ক্ষোভের বারুদ এবার আগ্নেয়গিরির মতো ফাটতে শুরু করেছে। খোদ দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত ‘আইপ্যাক’-এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন উত্তরবঙ্গের দুই দাপুটে নেতা-নেত্রী। তাঁদের সাফ কথা, দলটা এখন আর মানুষের নেই, হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মালিক-চাকর’ আর ‘কর্পোরেট’ হাউসের আখড়া।
সবচেয়ে বিস্ফোরক আক্রমণ শানিয়েছেন ইংরেজবাজার পুরসভার চেয়ারম্যান তথা প্রাক্তন মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরী। সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কাঠগড়ায় তুলে তাঁর অভিযোগ, “একজন ব্যক্তি দলটাকে তিলে তিলে শেষ করে দিলেন, তিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।” প্রবীণ এই নেতার দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের ভেতর ‘ধৃতরাষ্ট্র’ করে রাখা হয়েছিল। টিভিতে নেত্রীর লাঞ্ছনার দৃশ্য দেখে ব্যথিত কৃষ্ণেন্দুবাবু বলেন, “মমতাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছে, এমন দৃশ্য রাজনৈতিক জীবনে দেখিনি।”
প্রার্থী বাছাই নিয়ে অভিষেকের ‘কর্পোরেট’ বুদ্ধিকে কটাক্ষ করে তিনি জানান, হরিশ্চন্দ্রপুরে এমন একজনকে টিকিট দেওয়া হয়েছে যাঁর নূন্যতম ভাষাজ্ঞান নেই, আবার রতুয়ায় দাঁড় করানো হয়েছে ৮৪ বছরের এক অশক্ত বৃদ্ধকে। এই ভুল সিদ্ধান্তের মাসুলই আজ দলকে দিতে হচ্ছে বলে তাঁর দাবি।
ক্ষোভের আঁচ সমানভাবে আছড়ে পড়েছে শিলিগুড়িতেও। প্রাক্তন জেলা সভানেত্রী পাপিয়া ঘোষ দলের অন্দরে ‘দাসত্ব’ করার অভিজ্ঞতায় সরব হয়েছেন। অত্যন্ত তির্যক ভাষায় তিনি বলেন, “তৃণমূলে আমরা ছিলাম স্রেফ চাকর। দল চলেছে মালিক আর চাকরের সমীকরণে।” পাপিয়ার দাবি, বাংলার মানুষ তৃণমূলকে নয়, বরং দলের দাম্ভিক নেতাদের অহংকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
হারের জন্য তিনি সরাসরি আইপ্যাকের ‘দাদাগিরি’কে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, আইপ্যাকের হাতে অসীম ক্ষমতা থাকায় রাজ্যস্তরের নেতারা কার্যত পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়াকড়িতে আইপ্যাকের ‘ছক’ আর খাটেনি বলেই উত্তরবঙ্গে ঘাসফুল শিবিরের এই শোচনীয় পতন হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, মালদহ ও শিলিগুড়ির এই বিদ্রোহ কেবল হিমশৈলের চূড়া মাত্র। একদিকে কর্পোরেট সংস্কৃতি আর অন্যদিকে প্রবীণদের ব্রাত্য করে রাখা—এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েই যে বাংলার মসনদ হারাতে হলো তৃণমূলকে, তা এখন ঘরোয়া কোন্দলেই স্পষ্ট। এখন দেখার, এই ‘গৃহযুদ্ধ’ থামাতে কালীঘাট কী দাওয়াই দেয়, না কি ভাঙন আরও ত্বরান্বিত হয়।





