মধ্যবিত্তের সাধ্যের বাইরে বাড়ি! আকাশছোঁয়া দামের জেরে থমকে রিয়েল এস্টেট বাজার

একসময় বুকিংয়ের জন্য লাইন পড়ে যেত, আর এখন ফ্ল্যাট তৈরি হয়ে পড়ে রয়েছে, কিন্তু কেনার লোক নেই! বিজ্ঞাপন দিয়েও সাড়া মিলছে না তেমন। দেশের আবাসন বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন এক সমীক্ষায় উঠে এল অত্যন্ত উদ্বেগের ছবি। দেশের সাতটি প্রধান শহরে বাড়ি ও ফ্ল্যাট বিক্রির হারে ৬ শতাংশ পতন দেখা গিয়েছে। শুধু তাই নয়, গত জানুয়ারি-মার্চ ত্রৈমাসিকের তুলনায় এই হার ১১ শতাংশ কম।

দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চল, মুম্বই মেট্রোপলিটন এলাকা, পুণে, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, চেন্নাই এবং কলকাতা—গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে এই শহরগুলিতে বিক্রির হার কমেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলে ৬ শতাংশ, মুম্বই মেট্রোপলিটন এলাকায় ৮ শতাংশ, চেন্নাইয়ে ৯ শতাংশ এবং পুণেতে সবচেয়ে বেশি ১৫ শতাংশ পতন হয়েছে। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে বেঙ্গালুরুতে ১ শতাংশ, হায়দরাবাদে ২ শতাংশ এবং কলকাতায় বাড়ি-ফ্ল্যাট বিক্রিতে সামান্য বৃদ্ধি চোখে পড়েছে।

কিন্তু সামগ্রিক বাজারের এই মন্দার কারণ কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাথার ওপর ছাদ গড়তে হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্ত। তাঁদের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে ফ্ল্যাটের দাম। নির্মাতারা এখন ছোট ও সাধারণ আবাসনের বদলে ঝাঁ-চকচকে বিলাসবহুল বা প্রিমিয়াম আবাসন তৈরির দিকে ঝুঁকেছেন। সমীক্ষা বলছে, কলকাতায় নতুন আবাসন প্রকল্পের ৫৮ শতাংশই প্রিমিয়াম, যেগুলির দাম ৮০ লক্ষ থেকে ২.৫ কোটির মধ্যে। এই বিশাল অঙ্ক সাধারণ মানুষের স্বপ্নের বাইরে। একইভাবে চেন্নাইয়ে নতুন প্রকল্পের ৩৮ শতাংশই বিলাসবহুল।

করোনার পর রিয়েল এস্টেট বাজার যখন ফুলেফেঁপে উঠেছিল, নির্মাতারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে একের পর এক বড় টাওয়ার তৈরি শুরু করেন। গত ত্রৈমাসিকে প্রায় ১.০৬ লক্ষ নতুন ইউনিট তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল, যা আগের বছরের চেয়ে ৭ শতাংশ বেশি। কিন্তু বর্তমানে বাজারের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বিস্তর ফারাক তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং আয়ের অনিশ্চয়তা এই ধসের নেপথ্যে বড় কারণ।

CREDAI-এর প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট জি রাম রেড্ডির মতে, নির্মাণের খরচ অনেক বেড়ে গিয়েছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে ফ্ল্যাটের দামে। তিনি জানিয়েছেন, ‘সাধ্যের মধ্যে আবাসন’ বলতে কী বোঝায়, তার সংজ্ঞা পুনরায় বিচার করা প্রয়োজন। শহরাঞ্চলে মাসিক ১ লক্ষ টাকা উপার্জনকারী ব্যক্তিরাও এখন বড় অঙ্কের ঋণের ঝুঁকি নিতে ভয় পাচ্ছেন। খরচ বাঁচাতে অনেক ক্রেতাই শহরের মূল কেন্দ্র থেকে দূরে ফ্ল্যাট কেনার পথ বেছে নিচ্ছেন। যদিও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষেত্রে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা, কিন্তু বর্তমানে বাড়ির চাহিদা থাকলেও, মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া দামই আসল সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।