ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির পথে ‘আমিষ দুধ’ বিতর্ক, জেনেনিন বিষয়টি আসলে কি?

ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিতে ‘নিরামিষ দুধ’ বিতর্ক: ধর্মীয় ভাবাবেগের সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন
নয়াদিল্লি, ১৫ জুলাই, ২০২৫: ভারত এবং আমেরিকার মধ্যে বহু প্রতীক্ষিত বাণিজ্যিক চুক্তির শেষ মুহূর্তের আলোচনায় প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুগ্ধজাত পণ্য। কৃষি ও ডেয়ারি, এই দুটি ক্ষেত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা চললেও, ডেয়ারি পণ্যের আমদানিতে ভারতের ‘নিরামিষ দুধ’ নীতি আমেরিকার জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়াশিংটন বারবার ভারতের দুগ্ধবাজার খোলার জন্য আর্জি জানালেও, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ভাবাবেগের কারণে নয়াদিল্লি তাদের অবস্থানে অনড়।

‘নিরামিষ দুধ’ ঠিক কী?
ভারতের আপত্তির মূল কারণ হলো, গরু ব্যতীত অন্য কোনো মাংসাশী প্রাণীর দুধ বা সেই দুধ থেকে তৈরি পণ্য আমদানি না করা। একই সাথে, যে গরুদের মাংস বা রক্ত খাওয়ানো হয়, তাদের দুধও ভারতে প্রবেশাধিকার পাবে না। ভারত সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ভাবাবেগ রক্ষার্থে দুধ নিয়ে কোনো আপস করা হবে না। এটি ভারত-আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে একটি ‘রেড লাইন’ বা অলঙ্ঘনীয় সীমা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নয়াদিল্লি এও জানিয়েছে যে, আমদানি করা দুগ্ধজাত পণ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা হবে, যাতে নিশ্চিত করা যায় যে সেগুলি এই শর্ত পূরণ করছে।

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্পর্শকাতরতা
নয়াদিল্লির অন্যতম থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সংস্থা গ্লোবাল ট্রেন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে অজয় শ্রীবাস্তব এই বিষয়ে আলোকপাত করে বলেন, “কল্পনা করুন, আপনি এমন একটি গরুর দুধ থেকে তৈরি মাখন খাচ্ছেন যাকে অন্য গরুর মাংস এবং রক্ত খাওয়ানো হয়েছে। ভারত এমনটা কখনোই মেনে নেবে না।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দুগ্ধজাত পণ্য শুধুমাত্র খাদ্যদ্রব্য নয়, ভারতবাসীর কাছে এটি নিত্যদিনের নানা ধার্মিক রীতিনীতিরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। পূজা-অর্চনায় দুধ ও ঘি-এর ব্যবহার ভারতের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই এই বিষয়ে কোনো রকম ছাড় দেওয়া সম্ভব নয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং ভারতের অনড় মনোভাব
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে যে ডেয়ারি পণ্য নিয়ে ভারতের এই কঠোর অবস্থান বাণিজ্য চুক্তির পথে অপ্রয়োজনীয় বাধার সৃষ্টি করছে। তবে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুগ্ধ উৎপাদনকারী দেশ ভারত নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। চলতি মাসেই ইন্ডিয়া টুডে টিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শীর্ষ প্রশাসনিক এক আধিকারিক দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিলেন, “ডেয়ারি প্রোডাক্ট নিয়ে আমরা কোনো অবস্থানেই আপস করব না।”

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য সিয়েটল টাইমসের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, আমেরিকায় গরুদের শুয়োর, মাছ, মাংস, ঘোড়া এমনকি বিড়াল-কুকুরের মাংসও খাওয়ানো হয়। এছাড়াও শুয়োর ও ঘোড়ার রক্ত প্রোটিন উপাদান হিসেবে দেওয়া হয় গরুদের। এমন পরিবেশে উৎপাদিত দুধ ভারতে ‘আমিষ-দুধ’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং এর আমদানি নিয়ে ভারত সরকার ও জনসাধারণের মধ্যে তীব্র আপত্তি রয়েছে।

ভারত এবং আমেরিকার মধ্যে এই ‘নিরামিষ দুধ’ বিতর্ক বাণিজ্যিক আলোচনার জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এখন দেখার বিষয়, উভয় দেশ কীভাবে এই স্পর্শকাতর বিষয়টির একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করে।