উপত্যকায় ফের কি ৯০-এর দশকের সেই কালো দিন? ডার্ক ওয়েব ও টেলিগ্রামে টার্গেটেড হামলার আতঙ্কে কাঁপছে কাশ্মীর

ভূ-স্বর্গের বাতাসে কি ফের ৯০-এর দশকের সেই রক্তঝরা কালো দিনের আতঙ্ক ফিরে আসছে? পোস্টার বা দেওয়াললিখনের দিন শেষ, ইন্টারনেটের যুগে সন্ত্রাসবাদের ধরণ বদলে এবার সাইবার জগতে চরম থাবা বসাল জঙ্গিরা। ডার্ক ওয়েব, হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেওয়া হচ্ছে সরাসরি ‘লিভ-অর-ডাই’ (ছাড়ো নয়তো মরো) হুমকি। লস্কর-ই-তৈবা ঘনিষ্ঠ জঙ্গি সংগঠন ‘ইউনাইটেড লিবারেশন কাউন্সিল’ (ULC)-এর এই সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারিতে জম্মু-কাশ্মীরে কর্মরত প্রায় ৭,০০০ ‘পিএম প্যাকেজ’ কাশ্মীরি পণ্ডিত কর্মীর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

গত এক মাসে অন্তত পাঁচটি একই ধরণের হুমকি পত্র সামনে এসেছে। সম্প্রতি ১ সেপ্টেম্বরের হুমকি পত্রে সরাসরি জানানো হয়েছে, চাকরি না ছাড়লে এর পরিণতি হবে প্রাণঘাতী।

ফোন নম্বর, ঠিকানা ও গাড়ি নম্বর ফাঁস: সাইবার নিরাপত্তার মহা-বিপর্যয়

কেবল চিঠি বা বার্তা দেওয়াই নয়, জঙ্গিরা এবার মারাত্মক সাইবার অপরাধের পথ বেছে নিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি চাকরিতে কর্মরত কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর, বাড়ির ঠিকানা এবং গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর অনলাইনে ফাঁস করে দেওয়া হয়েছে।

সমাজকর্মী সাবা কৌল সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’-এ একে একটি “বিশাল ও উদ্বেগজনক নিরাপত্তা সংকট” হিসেবে অভিহিত করে দ্রুত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং জম্মু ও কাশ্মীরের উপরাজ্যপাল মনোজ সিনহার হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তথ্য ফাঁসের এই ‘মহা-বিপর্যয়’ নিয়ে অত্যন্ত শঙ্কিত কর্মীরা ইতোমধ্যেই সাইবার ক্রাইম উইংয়ের দরজায় কড়া নেড়েছেন।

পরিকাঠামো ও নিরাপত্তার চরম অভাব

হুমকির পাশাপাশি ট্রানজিট কলোনিগুলির জরাজীর্ণ অবস্থা সংকটকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ‘অল পিএম প্যাকেজ এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন’-এর প্রতিনিধি রাকেশ হান্দু অভিযোগ করেছেন, সরকার ৬,০৪২টি কোয়ার্টার তৈরির আশ্বাস দিলেও এ যাবৎ মাত্র ৮০০টি কোয়ার্টার বরাদ্দ করা সম্ভব হয়েছে। কুলগামের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় নিরাপত্তাহীন কোয়ার্টারে সংখ্যালঘু কর্মীদের থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা তাঁদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

উল্লেখ্য, ২০০৮ ও ২০১৫ সালে কেন্দ্র ঘোষিত পুনর্বাসন প্যাকেজের মাধ্যমে বিশেষ সরকারি চাকরি দিয়ে এই পণ্ডিতদের উপত্যকায় ফেরানো হয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সালে তেহসিল অফিসে রাহুল ভাটের মতো পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে টার্গেটেড কিলিংয়ের ক্ষত এখনও তাজা।

শুরু জোর রাজনৈতিক তরজা

এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির মাঝেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি। ন্যাশনাল কনফারেন্স প্রধান ফারুক আবদুল্লা পুরো ঘটনাটিকে প্রশাসনের ‘ভয় দেখানোর ষড়যন্ত্র’ বলে কটাক্ষ করেন। পাল্টা তোপ দেগে বিজেপির কেন্দ্রীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভাণ্ডারি অভিযোগ তোলেন, ফারুক আবদুল্লার এই দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য আসলে জঙ্গিদের পরোক্ষ সমর্থন যোগাচ্ছে এবং কাশ্মীরি হিন্দুদের আত্মত্যাগকে ছোট করছে। তবে মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা এই হুমকিকে গুরুত্ব দিয়ে কর্মীদের উপযুক্ত নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন।

১৯৯০-এর দশকে উগ্রপন্থার শিকার হয়ে ভিটেমাটি ছেড়েছিলেন হাজার হাজার কাশ্মীরি পণ্ডিত। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও আজ কেবল সরকারি চাকরি বা ইটের চারদেওয়াল নয়, উপত্যকায় সংখ্যালঘু কাশ্মীরি পণ্ডিতদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার ও আসল নিরাপত্তা নিয়েই আবারও বিরাট বড় প্রশ্নচিহ্ন উঠে গেল।