ভারত-নেপাল সম্পর্কে ফের চরম উত্তেজনা! লিম্পিয়াধুরা-লিপুলেখকে মানচিত্রে রেখে এক টাকার নতুন কয়েন আনছে কাঠমাণ্ডু!

ভারত ও নেপালের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ আবারও চড়তে শুরু করেছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল সরকার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে একটি নতুন এক টাকার কয়েন বা মুদ্রা বাজারে চালু করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সবথেকে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই নতুন মুদ্রার নকশায় সেই বিতর্কিত নেপালি মানচিত্রটিই বহাল রাখা হচ্ছে, যে মানচিত্রে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ এবং কালাপানির মতো সংবেদনশীল এলাকাগুলোকে নেপালের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। মূলত এই তিনটি এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও নেপালের মধ্যেকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক অন্যতম প্রধান স্পর্শকাতর সীমান্ত বিরোধ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। নেপালের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি করা হয় যে এই ভৌগোলিক অঞ্চলগুলো তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত, অন্যদিকে ভারতের স্পষ্ট ও অটল অবস্থান হলো যে লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ এবং কালাপানি ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে অতীতেও বহুবার অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই ধরনের যেকোনো জটিল সীমান্ত বিবাদের শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধান কেবল দুই বন্ধুভাবাপন্ন দেশের মধ্যেকার পারস্পরিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া বাঞ্ছনীয়।

নেপালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা নেপাল রাষ্ট্র ব্যাংক (এনআরবি)-এর সরকারি মুখপাত্র গুরু প্রসাদ পাউদেল সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে জানিয়েছেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক খুব শীঘ্রই একটি নতুন এক রুপির মুদ্রা বাজারে প্রচলন করতে চলেছে। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে মুদ্রাটির চূড়ান্ত ও আকৃতিগত ডিজাইন বা নকশা হাতে পায়নি, তথাপি তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন যে, এই নতুন মুদ্রার গায়েও সেই একই বিতর্কিত মানচিত্রটি খোদাই করা থাকবে, যেখানে ভারতের দাবি করা ওই তিনটি বিতর্কিত অঞ্চলকে নেপালের ভূখণ্ড বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, এই ভূরাজনৈতিক সীমান্ত বিরোধ প্রথমবার আন্তর্জাতিক মহলের এবং জনসমক্ষে তীব্রভাবে প্রকাশ্যে এসেছিল ২০২০ সালের মে মাসে। সেই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন নেপাল সরকার একতরফাভাবে একটি নতুন সরকারি মানচিত্র প্রকাশ করেছিল। সেই পরিবর্তিত মানচিত্রেই প্রথমবার লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ এবং কালাপানি অঞ্চলকে নেপালের মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত করে দেখানো হয়, যা নিয়ে উভয় দেশের কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল।

তবে এই পুরো ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে এক নাটকীয় মোড়। গত ২০শে জুলাই নেপাল সরকার হঠাৎ করেই এক টাকার প্রচলিত মুদ্রা বা কয়েন থেকে দেশের ওই বিতর্কিত মানচিত্রটি চিরতরে সরিয়ে সেখানে একটি ঐতিহাসিক বৌদ্ধ বিহারের ছবি খোদাই করার একটি বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সরকারের এই একক সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসতেই নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র ঝড় ওঠে। দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এবং সাধারণ সাধারণ মানুষ সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও আন্দোলন গড়ে তোলে। সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এতটাই বৃদ্ধি পায় যে কাঠমাণ্ডু প্রশাসন বাধ্য হয়ে তাদের পূর্বের সেই সিদ্ধান্ত থেকে সম্পূর্ণ পিছু হটে। জনগণের ক্রমবর্ধমান চাপে সেই নির্দেশ প্রত্যাহার করা হয় এবং নতুন মুদ্রায় সেই পুরোনো বিতর্কিত মানচিত্রটিকে পুনরায় বহাল রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নেপাল রাষ্ট্র ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাজারে আসতে চলা এই নতুন মুদ্রাটি বর্তমান ও প্রচলিত মুদ্রার তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা আকৃতি এবং ধাতুর তৈরি হবে। নতুন এই এক টাকার কয়েনটি আগের সংস্করণটির তুলনায় আকারে অনেকটাই ছোট ও ওজনে হালকা হবে, কিন্তু তার ডিজাইনে নেপালের সেই বিতর্কিত মানচিত্রটি অপরিবর্তিত থাকবে। নেপালের এই আকস্মিক ও কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত ভারত-নেপাল সীমান্ত বিরোধের পুরোনো আগুনকে আরও একবার আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। নয়াদিল্লির নীতি নির্ধারকদের মতে, এ ধরনের একতরফা পদক্ষেপ সীমান্ত সমস্যা সমাধানের পথকে আরও জটিল করে তোলে। ভারত বরাবরই দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির ওপর জোর দিয়ে জানিয়েছে যে, যেকোনো সংবেদনশীল সীমান্ত বিবাদ সমাধানের একমাত্র সঠিক মাধ্যম হলো গঠনমূলক আলোচনা।