সংসদ চত্বরে প্রিয়াঙ্কা-কল্যাণের হাসির খোরাক মমতা! কোন গোপন রাজনৈতিক সমীকরণে সরগরম রাজধানী?

চলতি সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহের মাঝেও দিল্লির সংসদ চত্বরে এক অভিনব ও নাটকীয় দৃশ্যের সাক্ষী থাকল জাতীয় রাজনীতি। শাসক ও বিরোধী দলের বহু হেভিওয়েট নেতার উপস্থিতিতে লোকসভা ও রাজ্যসভার করিডোরে এক অন্তরঙ্গ ও কৌতূহলোদ্দীপক মুহূর্ত তৈরি হয়, যেখানে কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে খোশগল্প ও হাসিঠাট্টায় মেতে উঠতে দেখা যায়। তবে তাঁদের এই সৌজন্যমূলক আলাপচারিতার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-র সঙ্গে টিএমসি সাংসদদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণ এবং দলবদল সংক্রান্ত বিতর্কের মাঝেই এই আকর্ষণীয় কথোপকথনটি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তীব্র ভাষায় পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ও পতন নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন যে, বিগত বছরগুলিতে রাজ্যে কংগ্রেসের রাজনৈতিক শক্তি ও উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই প্রসঙ্গেই তিনি দাবি করেন, “পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। ঠিক সেই কারণেই তাঁরা আমাদের দলে এসেছেন। যাঁরা একসময় কংগ্রেস ছেড়ে টিএমসিতে যোগ দিয়েছেন, তাঁরা আদতে কখনোই কংগ্রেসের নিজস্ব প্রতীকে সংসদে পৌঁছাননি।” নিজের রাজনৈতিক অতীত স্মরণ করে কল্যাণবাবু এও উল্লেখ করেন যে তিনি নিজেও জীবনের শুরুতে যুব কংগ্রেসের সহ-সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে আলোচনায় যোগ দেন পূর্ণিয়ার স্বতন্ত্র সাংসদ পাপ্পু যাদব, যিনি মন্তব্য করেন যে, ওই দলবদলু নেতারা সেই সময় কংগ্রেসের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। এর জবাবে তাৎক্ষণিকভাবে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সজোরে পাল্টা আক্রমণ শানিয়ে বলেন, “আমরাও তো একসময় কংগ্রেসীই ছিলাম।” এরপর কংগ্রেস শিবিরকে সরাসরি নিশানা করে তৃণমূল নেতা অত্যন্ত জোরালো ভাষায় প্রশ্ন তোলেন, “তোমরাই তো দিদিকে (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) দল থেকে জোর করে বের করে দিয়েছিলে। যদি তোমরা সেদিন মমতা ব্যানার্জীকে কোণঠাসা না করতে, তবে কি আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কংগ্রেসের এই করুন দশা দেখতে হতো?”
তৃণমূল সুপ্রিমোর সঙ্গে কংগ্রেসের ঐতিহাসিক ও দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এই বিতর্কের সুচারু জবাব দেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধা, স্নেহ ও সুসম্পর্ক বজায় ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই খোশগল্পের আবহ তৈরি হওয়ার ঠিক আগেই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এনসিপিআই-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া ২০ জন দলবদলু নেতার ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন। সেই প্রতিবাদের দিকে ইঙ্গিত করে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী কিছুটা মিষ্টি হাসির ছলে কটাক্ষ করে বলেন, “রাজনীতির চাকা কেমন ঘোরে দেখুন! কিছু লোক প্রথমে কংগ্রেস ছেড়ে আপনাদের দলে যোগ দিয়েছিল এবং এখন সেখান থেকেও তারা অন্যত্র বা বিজেপির দিকে চলে গেছে।”
উল্লেখ্য, চলতি বর্ষাকালীন অধিবেশনটি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য একাধিক কারণে অত্যন্ত ঘটনাবহুল হয়ে উঠেছে। গত ২২ জুলাই লোকসভার নিম্নকক্ষে এনসিপিআই সদস্যদের সঙ্গে চলা এক চরম উত্তপ্ত বিতর্কের সময় মহিলা সদস্যদের উদ্দেশে कथितভাবে “অশালীন” ভাষা ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এই ঘটনার জেরে অধিবেশনের শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে বর্ষাকালীন অধিবেশনের বাকি সমস্ত কার্যদিবসের জন্য লোকসভা থেকে বরখাস্ত করা হয়। সংসদ চত্বরে এই সমস্ত রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও প্রিয়াঙ্কা ও কল্যাণের এই খোলামেলা আলোচনা জাতীয় রাজনীতিতে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে।