বিএসএফ ক্যাম্পে রক্তের হোলি! প্রহরীর রাইফেল কেড়ে সহকর্মীদের ওপর এলোপাথাড়ি গুলি বিচারাধীন জওয়ানের!

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার বৈষ্ণবনগরে অবস্থিত সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (BSF) এক সদর দফতরে ঘটে যাওয়া এক রোমহর্ষক ও রক্তক্ষয়ী কাণ্ডে গোটা এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কোর্ট মার্শালের বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন বিএসএফের কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপে বন্দি থাকা এক বিচারাধীন জওয়ান কর্তব্যরত প্রহরীর হাত থেকে হঠাৎ করেই সার্ভিস রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে ব্যারেক লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করেন। এই মর্মান্তিক ও অপ্রত্যাশিত হামলায় ঘটনাস্থলেই রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন তিন বিএসএফ জওয়ান। পরবর্তী সময়ে তড়িঘড়ি তাঁদের উদ্ধার করে মালদা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা অজয় কুমার ও অম্বদর সুরেশ নামক দুই জওয়ানকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এছাড়া অপর এক আহত জওয়ান বিকাশ ব্রহ্ম বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থাও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে।
জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রকাশিত প্রেস বিবৃতি অনুযায়ী, অভিযুক্ত এই বিচারাধীন জওয়ানের নাম শিবম কুমার মিশ্র। সুনির্দিষ্ট কিছু গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে অফিশিয়াল কোর্ট মার্শালের প্রক্রিয়া চালমান ছিল। সেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই তাঁকে বৈষ্ণবনগরের ওই সুরক্ষিত বিএসএফ হেড কোয়ার্টারে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ করেই কি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, যার জেরে প্রহরীর অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তিনি এই নৃশংস পথ বেছে নিলেন, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আচমকা এই গুলির শব্দে গোটা ক্যাম্পজুড়ে চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। জীবন বাঁচাতে অন্য জওয়ানরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি শুরু করেন। তবে মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা আয়ত্তে এনে ক্যাম্পের অন্যান্য সাহসী জওয়ানরা দ্রুত যৌথভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে অভিযুক্ত শিবম কুমার মিশ্রকে নিরস্ত্র করেন এবং সফলভাবে আটক করেন।
এই বীভৎস ঘটনার পর থেকেই বৈষ্ণবনগরের সংশ্লিষ্ট বিএসএফ সদর দফতরের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার খবর পেয়েই রাতেই মালদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান বিএসএফের উচ্চপদস্থ শীর্ষ আধিকারিকেরা এবং জেলা পুলিশের একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। জেলা পুলিশ সুপার অনুপম সিং সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, পুরো ঘটনার একটি উচ্চপর্যায়ভিত্তিক পুলিশি তদন্ত ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট ধারায় কড়া মামলাও রুজু করা হয়েছে। কোন মানসিক চাপ বা বিশেষ পরিস্থিতিতে অভিযুক্ত জওয়ান এমন চরম হামলা চালালেন, কীভাবে তিনি অত্যন্ত কড়া প্রহরার মধ্যেও প্রহরীর অস্ত্র ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হলেন এবং সার্বিক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় কোনো ধরনের গাফিলতি বা ফাঁকফোকর ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রাথমিক তদন্তে জেলা পুলিশের বিভিন্ন মহলের অনুমান, অভিযুক্ত জওয়ান হয়তো দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশনের শিকার ছিলেন। তবে শুধুমাত্র মানসিক অবসাদই এই রক্তাক্ত হামলার একমাত্র কারণ কি না, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত নন তদন্তকারীরা। তাই তাঁর অতীতের মানসিক স্বাস্থ্য, সাম্প্রতিক আচরণবিধি এবং কোর্ট মার্শালের সমস্ত অফিশিয়াল নথিপত্র অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। যদিও ঠিক কী সুনির্দিষ্ট অভিযোগে শিবম কুমার মিশ্রের বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শালের বিচার প্রক্রিয়া এগোচ্ছিল, সেই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত মুখ খুলতে নারাজ বিএসএফ কর্তৃপক্ষ। স্পর্শকাতর তদন্তের স্বার্থেই এই গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। শুক্রবার মালদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই নিহত দুই বীর জওয়ানের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হবে। এরপর সম্পূর্ণ সামরিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁদের পবিত্র কফিনবন্দি মরদেহ পরিবারের শোকসন্তপ্ত সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট হাতে আসলে শরীরে কতগুলি গুলি বিদ্ধ হয়েছিল এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী ছিল, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা মিলবে। দেশের সীমান্ত এবং অভ্যন্তর সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা একটি সুশৃঙ্খল আধা-সেনা বাহিনীর সদর দফতরের ঠিক অন্দরেই এমন রক্তক্ষয়ী ও হিংসাত্মক ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই গোটা দেশের প্রতিরক্ষা মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বাহিনীর অন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বিচারাধীন কর্মীদের ওপর নজরদারির ঘাটতি এবং জওয়ানদের মানসিক স্বাস্থ্যের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলি এখন এই ঘটনার তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।