বন্যা থামলেও কমছে না দুর্ভোগ! অসমে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮, নতুন করে বৃষ্টির চোখ রাঙানি!

ধীরে ধীরে বন্যার জল নামতে শুরু করলেও উত্তর-পূর্বের রাজ্য অসমে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের রেশ কাটছে না। চলতি বছরের প্রলয়ঙ্করী বন্যায় মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮-এ। বুধবার অসমে শিবসাগর ও গোলাঘাট জেলায় আরও তিন জনের মৃত্যুর মর্মান্তিক খবর নিশ্চিত করেছে অসম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (ASDMA)। একই সঙ্গে সরকারি বুলেটিনে জানানো হয়েছে যে, এখনও পর্যন্ত রাজ্যের ৩ লক্ষেরও বেশি মানুষ বন্যার কোপে পড়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
সরকারি পরিসংখ্যাণ অনুযায়ী, বর্তমানে রাজ্যের শিবসাগর, চরাইদেও, গোলাঘাট, যোরহাট, নগাঁও, বিশ্বনাথ এবং কামরূপ মেট্রোপলিটন—এই মোট সাতটি জেলা ভয়াবহ বন্যার প্রভাবে ধুঁকছে। এখনও পর্যন্ত ২১টি রাজস্ব সার্কেল এবং ৫৫১টি গ্রাম পুরোপুরি জলমগ্ন অবস্থায় রয়েছে। এর পাশাপাশি প্রায় ২১ হাজার ৫২৩ হেক্টর কৃষিজমি জলের নিচে ডুবে থাকায় এলাকার কৃষকদের মাথায় হাত পড়েছে এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চরাইদেও জেলা, যেখানে প্রায় ১ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫৬১ জন মানুষ চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এরপরেই রয়েছে শিবসাগর (৮৪,৬০০ জন) এবং যোরহাট (৪৯,৯১১ জন)। মঙ্গলবারের তুলনামূলক পরিসংখ্যানের নিরিখে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা কিছু মাত্রায় কমলেও রাজ্যের সার্বিক পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক বলা চলে না।
বন্যায় গৃহহীন হওয়া ১৬ হাজার ৫০০-রও বেশি অসহায় মানুষ বর্তমানে বিভিন্ন এলাকার ৭১টি ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এ ছাড়া ৩০টি বিশেষ ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষকে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও দৈনন্দিন সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রশাসনের পাশাপাশি চিকিৎসক দল, পশুচিকিৎসক এবং জাতীয় ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF & SDRF) দুর্গত এলাকায় দিনরাত এক করে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বন্যার অবিরাম স্রোতে রাস্তাঘাট, মজবুত বাঁধ, স্কুল এবং বহু কাঁচা-পাকা বাড়িঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। সরকারি হিসাব বলছে, বন্যায় ১১ হাজারেরও বেশি গবাদি পশু ভেসে গেছে এবং প্রায় ১৭ হাজার পশু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর জল কিছুটা কমলেও কামরূপ মেট্রোপলিটন জেলায় জলাবদ্ধতা এক বিরাট সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। পদুমবাড়ি, বরাগাঁও, লাচিত নগর, জু রোড, হাতিগাঁও, অনিল নগর এবং নবীন নগরের মতো জনবহুল এলাকায় রাস্তায় জল জমে রয়েছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে বুধবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ টেলিফোনে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সঙ্গে কথা বলে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি ও ত্রাণকার্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। গত এক সপ্তাহের মধ্যে তাঁদের মধ্যে এটি দ্বিতীয় দফার উচ্চপর্যায় বৈঠক। মুখ্যমন্ত্রী জানান, কেন্দ্রীয় সরকার দুর্গত অসমের পাশেই রয়েছে এবং সমস্ত রকম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
ত্রাণ সামগ্রী পাঠানোর কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, গত ২১ জুলাইয়ের পর থেকে ভারী বৃষ্টি না হওয়ায় বন্যার জল নামতে শুরু করেছে, তবে ক্ষয়ক্ষতির বিশাল বহর দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে। বহু মানুষের বাড়িঘরের ভেতর কাদা ও পলিতে ভরে যাওয়ায় তারা এখনও ঘরে ফিরতে পারেননি। নাগাল্যান্ডের পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্তূপে অনেক সড়কপথ আজও অবরুদ্ধ হয়ে আছে।
তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের নির্দেশ অনুযায়ী বৃহস্পতিবার অসমে কর্মরত সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাঙ্কের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বন্যায় সর্বস্ব হারানো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ঋণ সংক্রান্ত বিশেষ আর্থিক সহায়তা বা ছাড় দেওয়ার বিষয়টি সেখানে গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করা হবে।
এদিকে ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর বা IMD আগামী ১ আগস্ট পর্যন্ত অসম, অরুণাচল প্রদেশ এবং নাগাল্যান্ডের একাধিক জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি এবং বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়ের পূর্বাভাস দিয়েছে। ইতিমধ্যেই তিনসুকিয়া জেলায় জারি করা হয়েছে কমলা সতর্কতা বা অরেঞ্জ অ্যালার্ট। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, নতুন করে প্রবল বৃষ্টিপাত শুরু হলে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস এবং সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভয়াবহ বিপদের ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যেতে পারে। সেই কারণে প্রশাসন দুর্গত এলাকার সাধারণ মানুষকে চরম সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশিকা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে।