বন্যা বিধ্বস্ত আসামে বাড়ল মৃতের সংখ্যা! ৭টি জেলায় জলবন্দি লক্ষাধিক মানুষ, সাহায্যের আশ্বাস কেন্দ্রের

আসামে ভয়াবহ বন্যার পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। রাজ্যটিতে বন্যাজনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে ৭৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি রাজ্যের সাতটি জেলায় ৩ লাখেরও বেশি মানুষ এখনও চরম বন্যা কবলিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। আসাম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (ASDMA)-র প্রকাশিত বুলেটিন অনুযায়ী, সর্বশেষ প্রাণহানির ঘটনায় শিবসাগর জেলায় দু’জন এবং গোলাঘাটে একজনের মৃত্যু হয়েছে। যার ফলে চলতি বছরের বন্যায় মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮-এ পৌঁছেছে। বর্তমানে যে সাতটি জেলা বন্যার কবলে রয়েছে সেগুলি হলো—শিবসাগর, চরাইদেও, গোলাঘাট, জোরহাট, নগাঁও, বিশ্বনাথ এবং কামরূপ মেট্রোপলিটন। এই জেলাগুলোর মোট ২১টি রাজস্ব সার্কেল ও ৫৫১টি গ্রাম এখনও জলের তলায় রয়েছে এবং প্রায় ২১,৫২৩.০৮ হেক্টর কৃষিজমিও সম্পূর্ণ প্লাবিত।

বন্যা-কবলিত জেলাগুলোর মধ্যে চরাইদেও জেলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি, যেখানে একা ১,৩৭,৫৬১ জন মানুষ বিপর্যস্ত হয়েছেন। এরপরেই রয়েছে শিবসাগর (৮৪,৬০৩ জন) ও জোরহাট (৪৯,৯১১ জন)। এর আগে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ছ’টি জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৩.৩২ লাখ। নতুন করে আরও একটি জেলা বন্যার কবলে যুক্ত হওয়া সত্ত্বেও সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হওয়া ১৬,৫০০-এরও বেশি মানুষ বর্তমানে রাজ্যের ৭১টি ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। পাশাপাশি আরও ৭২,০০০-এর বেশি মানুষকে ৩০টি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সাহায্য পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে মানুষের চিকিৎসার পাশাপাশি পশুচিকিৎসা দল এবং বিভিন্ন উদ্ধারকারী সংস্থা যৌথভাবে উদ্ধার ও ত্রাণকার্য চালিয়ে যাচ্ছে।

বন্যার আগ্রাসনে বাঁধ, রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, স্কুল এবং অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ASDMA জানিয়েছে, জলের তোড়ে ১১,০০০-এর বেশি গবাদি পশু ভেসে গেছে এবং আরও ১৭,০০০ গবাদি পশু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর জলস্তর বৃদ্ধির পাশাপাশি কামরূপ মেট্রোপলিটন জেলায় শহুরে বন্যা পরিস্থিতিও অব্যাহত রয়েছে। সরকারি বুলেটিন অনুযায়ী, এই জেলার তিনটি রাজস্ব সার্কেল এবং ১০টি এলাকা বা ওয়ার্ড এখনও জলের তলায়। প্রভাবিত এলাকাগুলোর মধ্যে পাডুমবাড়ি, বোরাগাঁও, লাচিত নগর, চিড়িয়াখানা রোড, রুক্মিনীগাঁও, অনিল নগর, নবীন নগর, হাতিগাঁও, জোরাবাট এবং কামারকুচির মতো জনবহুল অঞ্চলগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝে আসামের পাশে দাঁড়িয়েছে কেন্দ্র সরকার। বন্যা পরিস্থিতি ও চলমান ত্রাণ কার্যক্রমের গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনা করতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বুধবার আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সঙ্গে টেলিফোনে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। গত সাত দিনের মধ্যে এটি ছিল তাঁদের এ ধরনের দ্বিতীয় উচ্চপর্যায় বৈঠক। এর আগে গত ২৩ জুলাইও শাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছিলেন। আলোচনার পর মুখ্যমন্ত্রী শর্মা জানান, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজ্যের সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নিয়েছেন এবং ত্রাণ, পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের জন্য ভারত সরকারের তরফ থেকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি আরও জানান যে কেন্দ্রের সমস্ত সংস্থা ও সম্পদ আসামের এই বিপদের দিনে রাজ্যবাসীর সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।

গত ২১ জুলাইয়ের পর থেকে নতুন করে আর ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এবং নিচু এলাকাগুলো থেকে বন্যার জল কিছুটা নামতে শুরু করলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অত্যন্ত ব্যাপক। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, “বন্যার জল কমায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির বহর অত্যন্ত বিশাল। বহু মানুষ এখনও নিজেদের বাড়িঘরে ফিরতে পারছেন না, কারণ হয় তাঁদের ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে অথবা কাদা ও পলি জমে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এমনকি নাগাল্যান্ডের পাহাড় থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ কাদার কারণে কিছু কিছু এলাকায় রাস্তাঘাট এখনও অবরুদ্ধ হয়ে আছে।” মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করা এবং তাদের দুর্ভোগ লাঘব করাই এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা সম্পূর্ণ নাকচ করে তিনি বলেন যে এই সংকট একা মোকাবিলা করতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার—উভয়ই সম্পূর্ণ সক্ষম। সারা দেশ থেকে প্রচুর অনুদান আসছে বলেও তিনি জানান।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ কমাতে বড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের নির্দেশিকাকে সামনে রেখে তিনি বৃহস্পতিবার আসামে কার্যক্রম পরিচালনাকারী সমস্ত ব্যাংকের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায় বৈঠক করবেন। ওই বৈঠকে বন্যা-কবলিত সাধারণ নাগরিকদের পূর্বে নেওয়া ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে বিশেষ সহায়তা বা ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হবে।