কর্ণাটকের রাজনীতিতে তোলপাড় ফেলা ধর্ষণ মামলায় অবশেষে দোষী সাব্যস্ত হলেন জেডি(এস)-এর প্রাক্তন সাংসদ প্রজ্জ্বল রেভান্না। শুক্রবার বেঙ্গালুরুতে জনপ্রতিনিধিদের জন্য গঠিত বিশেষ আদালত তাকে এই ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে রায় দিয়েছে। আগামীকাল, শনিবার, বিশেষ আদালত তার সাজা ঘোষণা করবে, যা গোটা দেশের নজর কেড়েছে।
নির্বাচনী উত্তাপের মধ্যেই কেলেঙ্কারির ফাঁস ও গ্রেফতারি
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এইচ. ডি. দেবগৌড়ার নাতি প্রজ্জ্বলের ধর্ষণের একাধিক ভিডিও একটি পেনড্রাইভের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় তিনি কর্ণাটকের হাসান লোকসভা আসন থেকে ভোটে প্রার্থী হয়েছিলেন। যৌন কেলেঙ্কারির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরই তিনি গ্রেফতারি এড়াতে তড়িঘড়ি দেশ ছেড়ে জার্মানি পালিয়ে যান। তবে, ৩১শে মে মধ্যরাতে জার্মানি থেকে দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই কর্ণাটকের কেম্পেগৌড়া বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর থেকে গত ১৪ মাস ধরে প্রজ্জ্বল বেঙ্গালুরুর পারাপ্পানা আগ্রাহারা জেলে বন্দি রয়েছেন। এই ঘটনার পর জেডি(এস) দল তাকে সাসপেন্ড করে। পরবর্তীতে ভোটের ফল ঘোষণায় দেখা যায়, তিনি প্রায় ৪০ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছেন।
এক পরিচারিকার অভিযোগ: ধর্ষণ ও ভিডিও রেকর্ডিং
এদিন বিচারক গজানন হেজ ৪৮ বছর বয়সী এক মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগে প্রাক্তন জেডি(এস) সাংসদ প্রজ্জ্বলকে দোষী সাব্যস্ত করেন। ওই মহিলা প্রজ্জ্বলদের খামার বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতেন। বেঙ্গালুরু থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ওই খামার বাড়িটি। নির্যাতিতা মাইসোর জেলার বাসিন্দা। তিনি অভিযোগ করেন যে, ২০২১ সালে প্রজ্জ্বল তাকে দু’বার ধর্ষণ করেছিলেন এবং এই ঘটনাগুলির ভিডিও নিজের মোবাইলে ধারণ করেন।
কঠোর ধারায় মামলা ও তদন্তের গভীরতা
প্রাক্তন জেডি(এস) সাংসদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬(২)(এন), ৩৭৬(২)(কে), ৫০৬, ৩৫৪-এ, ৩৫৪(এ), ৩৫৪(বি), ৩৫৪(সি) ধারা এবং তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৬৬ই ধারায় সাইবার অপরাধ ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। কর্ণাটক সরকার এই মামলার তদন্তের জন্য একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করেছিল। তদন্তকারী কর্মকর্তারা মোট ১২৩টি প্রমাণ সংগ্রহ করেন এবং এই মামলায় ১১৩ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। গত বছর জনপ্রতিনিধি আদালতে সিট প্রজ্জ্বলের বিরুদ্ধে প্রায় ২ হাজার পাতার চার্জশিট জমা দিয়েছিল।
বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগ
কর্ণাটকের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এইচ. ডি. কুমারাস্বামীর ভাইপো প্রজ্জ্বলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি হাসানে তার খামার বাড়িতে ওই মহিলাকে ধর্ষণ করেন। পরবর্তীতে তার বাবা এইচ. ডি. রেভান্নার বাসস্থান বাসাভানাগুড়িতেও ওই মহিলাকে আবার ধর্ষণ করা হয় এবং সেই ঘটনার ভিডিও মোবাইলে রেকর্ড করে রাখা হয়।
এদিকে, এই মামলায় ছেলে প্রজ্জ্বলকে রক্ষা করতে তার বাবা এইচ. ডি. রেভান্না এবং মা ভবানী রেভান্নার বিরুদ্ধে নির্যাতিতাকে অপহরণের অভিযোগও ওঠে। অভিযোগ, নির্যাতিতা যাতে আদালতে সাক্ষ্য দিতে না পারেন, তার জন্য প্রজ্জ্বলের বাবা-মা এই চেষ্টা করেছিলেন। যৌন কেলেঙ্কারির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পরই রাজাগোপাল নামের এক ব্যক্তি নির্যাতিতাকে অপহরণ করে বলে অভিযোগ ওঠে। জানা যায়, রাজাগোপাল প্রজ্জ্বলের বাবা-মায়ের হয়েই এই কাজ করেছিল। নির্যাতিতাকে মাইসোর জেলার হুনসুর তালুকের একটি খামার বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিশেষ তদন্তকারী দল অভিযান চালিয়ে নির্যাতিতাকে উদ্ধার করে।
এদিন বিচারক রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর নাতি আদালত কক্ষেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এর আগে তাকে আদালত কক্ষেই মন্ত্রোচ্চারণ করতে দেখা গিয়েছিল। প্রজ্জ্বল রেভান্নার বিরুদ্ধে আরও তিনটি যৌন নিগ্রহ ও ধর্ষণের মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তার সাজা ঘোষণা নিয়ে এখন সবার দৃষ্টি আদালতের দিকে।





