নিট আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের বড় ঘোষণা! স্বস্তি দিয়ে বড় পদক্ষেপ বিজেপি-শাসিত তিন রাজ্যের

দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁসকাণ্ড এবং তার পরবর্তীতে ছাত্র-যুব সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলির তীব্র আন্দোলনের মুখে অবশেষে বড়সড় পদক্ষেপ গ্রহণ করল প্রশাসন। আন্দোলনের তীব্রতা এবং পরীক্ষার্থীদের লাগাতার প্রতিবাদের জেরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সমস্ত পুলিশি মামলা নিঃশর্তে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে একাধিক বিজেপি-শাসিত রাজ্য সরকার। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার ধর্মতলায় হওয়া তুমুল বিক্ষোভ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির জেরে পুলিশ যাদের গ্রেফতার করেছিল, সেই সমস্ত ধৃত আন্দোলনকারীদেরও দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জামিন দিয়ে দিয়েছে আদালত। এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে দেশজুড়ে আন্দোলনরত হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও প্রতিবাদী রাজনৈতিক কর্মীদের একটা বড় অংশের ওপর থেকে আইনি খড়্গ সাময়িকভাবে সরে গেল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল মূলত জাতীয় রাজধানী দিল্লি থেকে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নিট প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আগুন শুধু দিল্লিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা দ্রুত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিহার, অসম, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশ ও ঝাড়খণ্ড-সহ দেশের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে। ছাত্র ও যুব সমাজের এই স্বতঃস্ফূর্ত এবং ব্যাপক গণ-আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয় প্রশাসন। আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান এবং জোরালো দাবি ছিল যে, এই ন্যায্য গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার অপরাধে পুলিশি দমনপীড়নের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যে সমস্ত মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছে, সেগুলিকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। এমনকি এই দাবি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মানা না হলে গত সোমবার থেকেই ফের রাজ্যজুড়ে বৃহত্তর আন্দোলন ও তীব্র প্রতিবাদের হুশিয়ারি দিয়েছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা আরশোলা পার্টি। আর সেই প্রবল রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখেই অবশেষে নতিস্বীকার করে নিট আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সমস্ত ফৌজদারি মামলা একে একে প্রত্যাহার করে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেছে বিজেপি-শাসিত বিহার, অসম ও মহারাষ্ট্র সরকার।
বিহার পুলিশ ও রাজ্য প্রশাসনের তরফ থেকে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে যে, গত ২৫ জুলাই দেশব্যাপী চলা এই বিক্ষোভের জেরে মোট ৬৯৪ জনকে আটক করা হয়েছিল। এর মধ্যে আইনি বিধি মেনে ৩৩৯ জন নাবালক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক আন্দোলনকারীকে সঙ্গে সঙ্গেই ছেড়ে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে বাকি ৩৫৫ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে বিহারের স্বরাষ্ট্র দফতরের পক্ষ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি জারি করে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, গত ২৬ জুলাই সন্ধে ৬টার ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত এই বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী বা শামিল হওয়া কোনোও ব্যক্তির বিরুদ্ধেই সরকার ভবিষ্যতে আর কোনোও ধরনের শাস্তিমূলক বা কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না। একই পথে হেঁটে বিহারের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে আসামের সর্বানন্দ-হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরকারও। আসাম রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন স্থানে দায়ের হওয়া মোট ৫টি মামলার ভিত্তিতে সর্বমোট ১৩ জন নিট আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আসাম সরকারের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ধৃত ওই আন্দোলনকারীদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে থাকা সমস্ত পুলিশি মামলা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে অবিলম্বে তাদের সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হবে। পাশাপাশি, মহারাষ্ট্রের ফড়নবিশ সরকারও দেশজুড়ে আন্দোলনরত নিট পরীক্ষার্থী ও যুব সমাজকে বড় স্বস্তি দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আনা আইনি কোপ তুলে নেওয়ার যুগান্তকারী ঘোষণা করেছে।
মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বইয়ের ওরলি, দাদর, সিয়ন, মাহিম এবং ঐতিহাসিক শিবাজি পার্ক থানায় এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে মোট ১৩টি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছিল, সেই সমস্ত মামলাই অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেওয়ার কঠোর নির্দেশ জারি করেছে মহারাষ্ট্র সরকার। অন্যদিকে, এই একই জাতীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে কলকাতার ব্যস্ততম এলাকা ধর্মতলায় যে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ও ধুন্ধুমার কাণ্ড তৈরি হয়েছিল, সেই ঘটনার জেরে পুলিশ মোট ১৬ জন প্রতিবাদীকে গ্রেফতার করেছিল। মঙ্গলবার সেই ধৃত ১৬ জন আন্দোলনকারীকে আদালতে তোলা হলে বিচারক তাঁদের সকলেরই জামিন মঞ্জুর করেন। কলকাতার ব্যাঙ্কশাল আদালতের এই রায়ে কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন ধৃতদের পরিবার ও সমর্থকরা। এক লাফে দেশজুড়ে এই আইনি স্বস্তির খবর আসার পাশাপাশি সংসদের অন্দরেও এই প্রশ্নফাঁস নিয়ে তরজা তুঙ্গে উঠেছে। লোকসভার বাদল অধিবেশনে মোদি সরকারের আমলের সমস্ত প্রশ্নফাঁসের ধারাবাহিক তালিকা তুলে ধরে কেন্দ্রীয় সরকারকে চরম আক্রমণ শানিয়েছে কংগ্রেসসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলি। এর পাল্টা জবাবে ইউপিএ (UPA) সরকারের সুদীর্ঘ আমলেও যে দেশজুড়ে একের পর এক প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছিল, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরে বিরোধী শিবিরকে কড়া ভাষায় জবাব দিয়েছে শাসকদল বিজেপি।