জোড়া সাইক্লোনের আতঙ্ক কি সত্যি? ইসরোর স্যাটেলাইট চিত্রে মিলল বর্ষার আসল ও চাঞ্চল্যকর রহস্য!

দেশজুড়ে চলা টানা ও অবিরাম বর্ষণ দেখে সাধারণ মানুষের মনে প্রবল আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে যে বুঝি একসঙ্গে একাধিক শক্তিশালী সামুদ্রিক ঝড় বা সাইক্লোন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আছড়ে পড়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের সেই সমস্ত আশঙ্কা ও জল্পনা সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দিয়ে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা তথা ইসরো (ISRO) এবং ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD)-এর যৌথ ট্র্যাকিং রিপোর্ট অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, বর্তমান এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি কোনো জোড়া ঝড় বা সামুদ্রিক তাণ্ডব নয়, বরং একটিমাত্র নির্দিষ্ট আবহাওয়া ব্যবস্থার প্রভাবে ঘটে চলা স্বাভাবিক বর্ষণ মাত্র। বর্তমানে অত্যন্ত ঝিমিয়ে পড়া গতিতে, অর্থাৎ ঘণ্টায় মাত্র ১২ কিলোমিটার বেগে স্থলভাগের অনেক গভীরে এগিয়ে চলেছে এই শক্তিশালী নিম্নচাপটি। এর জেরে বঙ্গোপসাগর কিংবা আরব সাগর—কোনো অঞ্চলেই বর্তমানে ঝড়ের মতো কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতির অস্তিত্ব বা আশঙ্কা নেই।

ইসরোর তৈরি এবং আবহাওয়া দফতরের নিবিড় পরিচালনায় পরিচালিত অত্যাধুনিক আবহাওয়া উপগ্রহ ‘ইনস্যাট-৩ডিআর’ (INSAT-3DR)-এর শক্তিশালী ইনফ্রারেড ক্যামেরায় ধরা পড়া আবহাওয়ার নিখুঁত চালচিত্রে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। এই বিশেষ স্যাটেলাইটটি দৃশ্যমান আলোর পরিবর্তে মূলত তাপমাত্রা পরিমাপ করে থাকে। ছবিতে মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও কম তাপমাত্রার মেঘের উপরিভাগ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সাদা ও হালকা গোলাপি রঙে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা মূলত তীব্র বজ্রগর্ভ মেঘের ব্যাপক উপস্থিতির প্রমাণ দেয়। বর্তমান স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, মূল নিম্নচাপটির মূল ‘বৃষ্টির ইঞ্জিন’টি বঙ্গোপসাগর থেকে বহু দূরে বর্তমানে ছত্তিশগড়, ওড়িশা এবং মধ্যপ্রদেশ অঞ্চলের ওপর অবস্থান করছে। অন্যদিকে, মহারাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে আরব সাগরের কাছাকাছি যে দ্বিতীয় মেঘের বিশাল জটলা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, তা আদতে নতুন কোনো সমুদ্রঝড় নয়। মূলত মূল সিস্টেমটিই আরব সাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে আর্দ্রতা টেনে এনে পশ্চিমঘাট পর্বতের গায়ে ধাক্কা দিয়ে এই ব্যাপক বৃষ্টিপাত তৈরি করছে।

আবহাওয়া দফতরের সুনির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে জন্ম নেওয়া গভীর নিম্নচাপ বা ‘ডিপ ডিপ্রেশন’টি বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে স্থলভাগে প্রবেশ করে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে। এর গতিবেগ অত্যন্ত শ্লথ, যা ঘণ্টায় মোটে ১২ কিলোমিটার। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকালের নিম্নচাপ কখনোই ঝড়ের মতো তীব্র গতিতে ছোটে না। বরং এই মন্থর ও ধীর গতিই নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে দীর্ঘক্ষণ ধরে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প ধরে রেখে মুষলধারে বৃষ্টিপাত ঘটানোর সুবর্ণ সুযোগ করে দেয়। উত্তর বঙ্গোপসাগরে যেখানে মাত্র কয়েক দিন আগে এই শক্তিশালী সিস্টেমের জন্ম হয়েছিল, সেই উত্তর অংশ এখন সম্পূর্ণ শান্ত ও স্থিতিশীল রয়েছে। সেখানে বর্তমানে কোনো ঘূর্ণায়মান বা ঘনীভূত নিম্নচাপের ন্যূনতম অস্তিত্ব নেই, কেবল বিক্ষিপ্ত কিছু মেঘের টুকরো ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে। একইভাবে, আরব সাগরের মধ্য ও উত্তর অংশও আপাতত সম্পূর্ণ পরিষ্কার রয়েছে। পশ্চিম উপকূলে যে লাগাতার বৃষ্টি হচ্ছে, তা মূল সিস্টেমের টানে বয়ে চলা আর্দ্র বায়ুর সরাসরি ফল। পূর্ব-মধ্য আরব সাগরে অতীতে তৈরি হওয়া দুর্বল ঘূর্ণাবর্তটিও ক্রমশ নিজের শক্তি হারিয়ে চিরতরে মিলিয়ে গেছে।

আবহাওয়াবিদদের অভিমত অনুযায়ী, স্থলভাগের গভীরে অনেক দূর প্রবেশ করে এই নিম্নচাপটি ধীরে ধীরে আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে আগামী দিনে বৃষ্টির তীব্রতা ও প্রকোপও কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এটি যে বিপুল পরিমাণ আর্দ্রতা দেশের অভ্যন্তরে টেনে এনেছে, তার জোরালো প্রভাবে আগামী বেশ কিছুদিন দেশের একটি বিশাল অংশে আকাশ মেঘলা ও ঝিরঝিরে থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। যেহেতু সাগরে নতুন করে কোনো ঘূর্ণাবর্ত বা সিস্টেম দানা বাঁধছে না, তাই বর্তমানের এই ঝোলাঝুলি আবহাওয়ার পর সাধারণ মানুষ খুব শীঘ্রই সাময়িক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবেন বলেই মনে করা হচ্ছে। বর্তমান এই পরিস্থিতিতে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলে মৎস্যজীবীদের সম্পূর্ণভাবে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। বিশেষ করে বজ্রপাতের সময় খোলা আকাশের নিচে না থেকে পাকা ঘরের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। লাগাতার বৃষ্টির জেরে যে সমস্ত এলাকায় পাহাড়ি বা নিচু জমির মাটি আলগা হয়ে গেছে, সেখানে স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকে জারি করা বন্যা ও ধস সংক্রান্ত সতর্কবার্তাগুলোর ওপর কড়া নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।