উপদ্রবীদের বাঁচাতেই কি চুক্তি? সিজেপির আন্দোলনের জেরে পুলিশের এফআইআর প্রত্যাহার নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড়!

দিল্লির রাস্তায় সোমবার এক অপ্রত্যাশিত ও রোমহর্ষক রাজনৈতিক থ্রিলার প্রত্যক্ষ করল দেশবাসী। নীতি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং অন্যান্য দাবিতে সোচ্চার হয়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র নেতাকর্মীরা জंतरঝান্তরের শান্ত পরিবেশ ছেড়ে সোজাসুজি হাই-সিকিউরিটি জোন ও সংসদ ভবন ঘেরাওয়ের উদ্দেশ্যে চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়ে এগিয়ে যান। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের রূপ বদলে নিমেষেই তা হিংসাত্মক রূপ নেয়। রাস্তায় ব্যারিকেড ভেঙে ইটবৃষ্টি, হাতাহাতি এবং পুলিশের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হন আন্দোলনকারীরা। এই তাণ্ডবে প্রায় ৯১ জন পুলিশকর্মী ও ১৩ জন সাধারণ নাগরিক গুরুতর আহত হন এবং ১৫টি সরকারি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ আধিকারিক এই সহিংসতায় তাঁর একটি চোখ চিরতরে হারিয়েছেন।
পরিস্থিতির সামাল দিতে এবং ৩৬ দিন ধরে চলা অচলাবস্থা কাটাতে শেষমেশ কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে আন্দোলনকারীদের সমস্ত শর্ত মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। এর ফলস্বরূপ, বিহার ও আসাম সরকার বিজ্ঞপ্তি জারি করে সিজেপি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সমস্ত মামলা এবং এফআইআর অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঐতিহাসিক ঘোষণা করে। প্রকাশিত সরকারি নির্দেশিকায় জানানো হয়, নির্দিষ্ট সময়ের আগে ধৃত সমস্ত বন্দিকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে আর কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। উল্লেখ্য, এই ঘটনায় বিহার পুলিশ প্রায় ৬৯৪ জন উপদ্রবীকে আটক করেছিল।
তবে সরকারের এই আপসকামিতা নিয়ে দেশজুড়ে প্রবল আইনি ও নৈতিক বিতর্কের ঝড় উঠেছে। সাধারণ নাগরিকদের মনে তীব্র প্রশ্ন জেগেছে যে, রাষ্ট্র কি তবে রাজনৈতিক চাপে নুইয়ে পড়ে অপরাধীদের সামনে হাঁটু গেটে বসল? আইনবিদদের একাংশের মতে, ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে কার্যনির্বাহী বিভাগের সরাসরি এফআইআর তুলে নেওয়ার কোনো একচ্ছত্র আইনি অধিকার নেই। অপরাধ সর্বদাই সমাজের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS) অনুযায়ী, জঘন্য দাঙ্গা, ভাঙচুর বা পুলিশের ওপর হামলার মতো অপরাধগুলি ‘কম্পাউন্ডেবল’ বা সমঝোতাযোগ্য অপরাধের আওতাভুক্ত নয়। একমাত্র আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আইনি নিষ্পত্তি সম্ভব।
এদিকে সুপ্রিম কোর্ট এই ঘটনায় অত্যন্ত কড়া মনোভাব পোষণ করেছে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন শীর্ষ আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে, তাদের কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতেই হবে। আদালত পুলিশ ও আন্দোলনকারী উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে, যাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই, শুধুমাত্র তাঁদের ক্ষেত্রেই মুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। সিজেপি নেতৃত্বের তরফ থেকে কড়া হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, প্রতিশ্রুতিমতো এফআইআর প্রত্যাহারে দেরি হলে দেশজুড়ে পুনরায় বড়সড় আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। ক্ষমতার লড়াইতে শেষ পর্যন্ত আইনের শাসন কতটা অক্ষুণ্ণ থাকে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।