‘ধূমপান করেন না মানেই ক্যানসার থেকে মুক্ত নন!’ ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকা এই বিষাক্ত ধোঁয়া কেড়ে নিচ্ছে ফুসফুস ও অন্ত্রের প্রাণ

অনেকেই মনে করেন যে নিজে সিগারেট বা বিড়ি না খেলে ক্যানসারের মতো মারণ রোগের কোনো ভয় থাকে না। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আপনি যদি নিজে ধূমপান না-ও করেন, তবু নিয়মিত অন্যের সিগারেটের ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে আপনার শরীরে প্রবেশ করলে ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে দেশের লক্ষ লক্ষ নারীর ক্ষেত্রে এই মারাত্মক ঝুঁকি দীর্ঘদিন অদৃশ্য থেকে যায়, কারণ তাঁরা নিজেরাই ধূমপায়ী না হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই সতর্কতার বৃত্তের বাইরে থেকে যান।

পরোক্ষ ধূমপান বা সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোক বলতে মূলত সেই ধোঁয়াকে বোঝায়, যা কোনো ব্যক্তি সিগারেট বা বিড়ি সেবন করার পর বাতাসে ছড়িয়ে দেন কিংবা নিজের নিঃশ্বাসের সঙ্গে বাইরে বের করেন। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই ধরনের বিষাক্ত ধোঁয়ায় ৭,০০০-এরও বেশি বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যার মধ্যে অন্তত ৭০টি সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে চিহ্নিত। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই অদৃশ্য বিপদ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান ও গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (GATS)-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ৩৯.৩ শতাংশ নারী তাঁদের নিজ গৃহের অভ্যন্তরেই অন্যের ধূমপানের ধোঁয়ার প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসেন। এর অর্থ দাঁড়ায় যে, দেশের কোটি কোটি নারী প্রতিদিন অজান্তেই এই বিষাক্ত ধোঁয়া গ্রহণ করে নিজেদের জীবন বিপন্ন করছেন।

ধূমপানের এই পরোক্ষ প্রভাব কেবল ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে তা নয়, এর জেরে মানুষের মুখগহ্বর এবং অন্ত্রও ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোকের সংস্পর্শে থাকার ফলে শরীরের অভ্যন্তরে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার স্বাভাবিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে অন্ত্রে মারাত্মক প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন বৃদ্ধি পায়, যা ভবিষ্যতে ভয়াবহ কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে। একইসঙ্গে, মুখের ভেতরের সংবেদনশীল কোষগুলিও ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসে প্রতি মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন চিকিৎসাগত গবেষণায় স্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছে যে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোকের পরিবেশে বসবাস করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে মুখের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।

এই নীরব ঘাতক থেকে সুরক্ষার জন্য কিছু উপসর্গ বা লক্ষণ কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। যদি মুখগহ্বরে বারবার ঘা হওয়ার সমস্যা দেখা দেয়, মাড়ি থেকে রক্তপাত হয় বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ থাকে, খাবার গিলতে তীব্র অসুবিধা হয় কিংবা দীর্ঘদিন ধরে পেটের হজমের গণ্ডগোল ও অস্বস্তি লেগেই থাকে, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই উপসর্গগুলির অর্থই যে সরাসরি ক্যানসার, এমনটা নয়; কিন্তু সময়মতো সঠিক পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

নিজেকে ও নিজের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। সবার আগে বাড়ির ভেতরে বা বন্ধ ঘরে কাউকে ধূমপান করতে দেবেন না। শিশু এবং গর্ভবতী নারীদের আশপাশে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করুন। এমনকি গাড়ির কাচ নামিয়েও গাড়ির ভেতরে ধূমপান করা থেকে বিরত থাকুন। আপনার কর্মক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ধোঁয়ামুক্ত এবং নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার দাবি তুলুন। মনে রাখবেন, মারণ রোগ ক্যানসারের ঝুঁকি কেবল যারা সরাসরি ধূমপান করেন তাঁদের একার নয়। একটি সম্পূর্ণ ধোঁয়ামুক্ত ঘর ও কর্মস্থল নারীদের ফুসফুস, মুখ এবং অন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।