তন্ত্রসাধক ভৃগুরামের তপস্যায় আবির্ভূতা! নবদ্বীপের ‘বড়শ্যামা মাতা’-কে নিয়ে কেন আজও মেজো-সেজো-ছোট শ্যামার পুজো হয়?

ঐতিহ্য, তন্ত্রসাধনা এবং ভক্তির এক ত্রিবেনী সঙ্গম দেখা যায় প্রতি বছর রাস পূর্ণিমার রাতে। আর সেই পুণ্য লগ্নেই নবদ্বীপের তেঘরী পাড়ায় অনুষ্ঠিত হয় বড়শ্যামা মাতার আরাধনা। এই বছর এই ঐতিহাসিক পুজো পদার্পণ করল তার ৩০৮তম বর্ষে, যা নবদ্বীপের সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে।
১৭১৮ সালে শুরু: মহারাজার দান ও তন্ত্রসাধকের সাধনা
এই পুজোর ইতিহাস শুরু হয় ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দে। এর প্রবর্তক ছিলেন বিখ্যাত তন্ত্রসাধক ভৃগুরাম সদ্ধান্ত। কথিত আছে, ভৃগুরামের গভীর তপস্যা ও সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে সেই সময়ের অবিভক্ত বাংলার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে তেঘরী মৌজায় ১২০০ বিঘা ভিটা জমি ও ১০০০ বিঘা মাঠের জমি দান করেন। সেই বিশাল ভূমির ওপর ভিত্তি করেই শুরু হয়েছিল বড়শ্যামা মাতার এই মহিমা মণ্ডিত পূজা।
প্রথমদিকে পুজোটি পারিবারিক হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এটি এখন সার্বজনীন রূপ নিয়েছে।
বিশেষত্ব: চাঁদা ছাড়াই চলে পুজো!
বড়শ্যামা মাতার পূজার সবচেয়ে আশ্চর্যজনক এবং গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হল — এখানে জনসাধারণের কাছ থেকে কোনো চাঁদা সংগ্রহ করা হয় না!
পূজার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হয় “দি ট্রাস্টিস অব বড়শ্যামা মাতা” নামক একটি স্থায়ী ট্রাস্টি ফান্ডের মাধ্যমে। এই ব্যতিক্রমী পদ্ধতিটি এই পুজোকে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছে।
২৯ ফুটের দেবী ও বংশানুক্রমিক পুরোহিত
বিশাল প্রতিমা: এই মন্দিরের মূল আকর্ষণ হল ২৯ ফুট উচ্চতার দেবীমূর্তি, যা শুধুমাত্র রাস পূর্ণিমার দিনই নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠা করে পূজা করা হয়। সারা বছর শুধুমাত্র মাতার ঘটে পুজো চলে।
মন্দির নির্মাণ: বর্তমানের সুন্দর মন্দিরটি গড়ে ওঠে ১৯৮৪ সালে, প্রায় ৮০,০০০ টাকা ব্যয়ে।
বংশপরম্পরা: ভৃগুরাম সদ্ধান্তের তিন পুত্র—গদাধর, কৃষ্ণরাম ও রামগোপালের বংশধরেরাই আজও এই পূজার পুরোহিত। কঠোর নিয়ম মেনে, বাইরের কোনো পুরোহিতের এখানে পূজা করার অনুমতি নেই।
নবদ্বীপের এই অঞ্চলে বড়শ্যামা মাতার পাশাপাশি মেজো, সেজো ও ছোট শ্যামা মাতারও পুজো অনুষ্ঠিত হয়, যা এই অঞ্চলের ধর্মীয় পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
শতাব্দী প্রাচীন এই পুজোকে ঘিরে প্রতি বছর রাস পূর্ণিমার এই পুণ্যক্ষণে নবদ্বীপে ভক্তদের ঢল নামে। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, বড়শ্যামা মাতার অকৃপণ আশীর্বাদে জীবনের সকল অন্ধকার দূর হয়ে নতুন আলোর সঞ্চার হয়।