‘ছেলের স্বপ্নের জন্য গয়না বন্ধক রেখেছিলেন মা’! সেই জ্যোতি মণ্ডলই গড়লেন বিশ্বরেকর্ড, গর্বে ভাসছে আলিপুরদুয়ার

ছেলের নাচের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে একসময় নিজের গয়না বন্ধক রেখেছিলেন মা। সেই ত্যাগের মূল্য ফিরিয়ে দিয়ে আলিপুরদুয়ারের বীরপাড়ার বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী জ্যোতি মণ্ডল (এলাকায় পরিচিত দেবজ্যোতি) কথক নৃত্যে স্থাপন করলেন বিশ্বরেকর্ড। মাত্র ৩০ সেকেন্ডে টানা ৬৮ বার নিখুঁত ঘূর্ণন দেখিয়ে তাঁর নাম উঠল গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে। এই সাফল্যে আবেগ আর গর্বে ভাসছে তাঁর পরিবার ও বন্ধুমহল।

জ্যোতি মণ্ডলের বাবা কয়েক বছর আগেই প্রয়াত হয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর মা বীণা মণ্ডল একটি ছোট দোকান চালিয়ে সংসার চালান। অর্থাভাব সত্ত্বেও ছেলের নাচের প্রতি ভালোবাসায় তিনি কখনও বাধা দেননি। বরং গয়না বন্ধক রেখে ছেলেকে নাচ শিখতে পাঠিয়েছিলেন গুজরাত এবং কলকাতায়। আজ কথক নৃত্যে জ্যোতি এলাকায় এক পরিচিত মুখ। বর্তমানে তিনি বিন্নাগুড়ি আর্মি স্কুলে নৃত্যের শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন এবং বীরপাড়ায় তাঁর নিজস্ব ডান্স অ্যাকাডেমিও রয়েছে।

সাফল্যের নেপথ্যে দীর্ঘ অধ্যবসায়:

কথক নৃত্যের অপরিহার্য অঙ্গ হলো নিখুঁত ঘূর্ণন বা স্পিন। জ্যোতি বেশ কয়েকবার এই পারদর্শিতায় বিশ্বরেকর্ডের চেষ্টা করেও সফল হননি। তবে তিনি হার মানেননি। গত অক্টোবর মাসে তিনি গিনেস কর্তৃপক্ষের নিয়ম মেনে পারফরম্যান্সের ভিডিও, সময়-পরিমাপের দলিল এবং প্রয়োজনীয় সমস্ত নথি ফের পাঠান। দুর্গাপূজার সময় আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত স্বীকৃতি। সম্প্রতি তাঁর হাতে সেই সংশাপত্রও এসে পৌঁছেছে।

নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে জ্যোতি মণ্ডল বলেন, “২০১২ সাল থেকে কথক শিখছি। যতবার সুযোগ পাই, কলকাতা ও আহমেদাবাদ গিয়ে গুরুদের কাছে রেওয়াজ করি। ২০১৯ সাল থেকে প্রতিবছর আবেদন করেও সফল হতে পারিনি। অবশেষে সফল হলাম। স্বপ্নটা সত্যি হল। গুরু ও বাবা-মায়ের আশীর্বাদ ছাড়া এটা সম্ভব হত না। এখন আমার লক্ষ্য – নিজের এই রেকর্ডকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়া।”

ভারতের অন্যতম শাস্ত্রীয় নৃত্য কথক-এর ছন্দ, ঘূর্ণন ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণের নিপুণ সমন্বয়কে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরলেন জ্যোতি। তাঁর এই সাফল্য নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করবে বলে আলিপুরদুয়ারের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা তাঁকে অভিনন্দনে ভরিয়ে দিচ্ছেন।

মায়ের চোখে আনন্দাশ্রু:

ছেলের এই বিশ্বরেকর্ডে আনন্দের অশ্রু তাঁর মা বীণা মণ্ডলের চোখে। আবেগ ভরা কণ্ঠে তিনি বলেন, “ছেলের স্বপ্নকে কখনও থামাইনি। কত কষ্ট করেছি। ছোট থেকেই মনে হত ও কিছু একটা করবে, কিন্তু ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করে ফেলবে ভাবিনি। আজ ছেলের পরিশ্রম সার্থক হল।”