ক্ষমতা হারানোর পরেই কি বিবেক জাগ্রত? তৃণমূলের মঞ্চে হঠাৎ ‘শহীদ তর্পণ’ নিয়ে তীব্র বিতর্ক!

রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিন্দে থাকাটাই যে আসল নিয়ন্ত্রক, তা আবারও প্রমাণ হলো। ক্ষমতা থেকে তৃণমূল কংগ্রেস ছিটকে যাওয়ার মাত্র দুমাস দশদিনের মধ্যেই দলের অন্দরমহলে এক অদ্ভুত পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। যে নেতানেত্রীরা এতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে মঞ্চ আলো করে দাঁড়িয়ে থাকতেন, তাঁদের অনেকেরই যেন হঠাৎ ‘জ্ঞানচক্ষু’ খুলে গেছে।

একসময় যে ২১শে জুলাইয়ের মঞ্চে শহীদ স্মরণের নামে দেদার নাচ-গান চলত, আজ তা নিয়ে ববি হাকিমদের গলায় ভিন্ন সুর। ববি হাকিম সাফ জানিয়েছেন, “আগে শহীদ তর্পণের নামে নাচ-গান হতো, এবছর শহীদ তর্পণ হবে।” এই মন্তব্যের পরেই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন, যখন সেই মঞ্চে একের পর এক বিতর্কিত ‘পাগলু-ডান্স’ চলত, তখন কি এই নেতানেত্রীরা অন্ধ ছিলেন? সেদিন তো তাঁদেরই উৎসাহে মঞ্চ সরগরম থাকত, হাততালির আওয়াজও ছিল আকাশচুম্বী। তাহলে চৌঠা মে-র আগে কি একবারও মনে হয়নি যে, শহীদের অমর্যাদা হচ্ছে?

ইতিহাস বলছে, ক্ষমতার দাপটে যখন দল থাকে তুঙ্গে, তখন দলের প্রতিটি সিদ্ধান্তই হয়ে ওঠে ‘সর্বোত্তম’। কিন্তু ক্ষমতা থেকে দূরে সরতেই সেই একই মঞ্চ, সেই একই অনুষ্ঠান হঠাৎ ‘অশুদ্ধ’ মনে হতে শুরু করেছে। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের মতো নেত্রীরা এখন ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, অনুষ্ঠানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থাকা বা না থাকাটা এখন আর বড় কোনো বিষয় নয়। রাজনীতির মাঠে একে অনেকেই ‘সুবিধাবাদী ভোলবদল’ বলে অভিহিত করছেন।

রাজনীতিতে এই ধরনের ইউ-টার্ন নতুন কিছু নয়, তবে সময়কালটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ক্ষমতা হারানোর আড়াই মাসের মধ্যেই নেতাদের এই ‘বিবেক জাগ্রত’ হওয়ার নাটক কি নিছকই কাকতালীয়? নাকি এটি জনরোষ থেকে বাঁচতে নিজেদের ভাবমূর্তি বদলানোর একটি মরিয়া প্রচেষ্টা? সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে, ক্ষমতা গেলে কি সত্যিই মানুষের বিবেক জাগ্রত হয়? নাকি ক্ষমতা আর বিবেকের মধ্যে সম্পর্কটা এতটাই বিপরীতমুখী যে, একটির বিদায় না ঘটলে অন্যটির জাগরণ সম্ভব নয়?

তৃণমূলের এই নতুন রূপ নিয়ে রাজ্যজুড়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। একদিকে যখন দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই চলছে, অন্যদিকে তখনই নেতাদের এই ‘আদর্শগত পরিবর্তনের’ দাবি কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নেতারাই যখন নিজেদের অতীত কর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তখন সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। এখন দেখার বিষয়, এই ‘বিবেক জাগ্রত’-এর মহড়া সাধারণ মানুষের মন গলাতে পারে কি না, নাকি এটি কেবলই রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার একটি ব্যর্থ চেষ্টা।