একুশে জুলাই কি ভোটার কার্ডের আন্দোলনের ফসল? ফাঁস হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নির্লজ্জ মিথ্যাচার’!

উনিশশো তিরানব্বই সালের একুশে জুলাইয়ের সেই মর্মান্তিক ঘটনার তেত্রিশ বছর পার হয়ে গেছে। কলকাতার রাজপথ যেদিন চোদ্দজন যুবকের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, সেই স্মৃতি আজও বাঙালির মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। তবে সেই ঘটনার প্রেক্ষাপট নিয়ে বর্তমানে যে রাজনৈতিক বিতর্ক দানা বেঁধেছে, তা এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর মতে, বিজেপির পাল্টা ন্যারেটিভ তৈরি করতে গিয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একুশে জুলাইয়ের দাবি নিয়ে ভুল ইতিহাস প্রচার করছেন।

ঘটনাচক্রে, গত কয়েক বছর ধরে তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্ব এক স্বরে দাবি করে আসছেন যে, উনিশশো তিরানব্বই সালের ওই আন্দোলন ছিল সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র বা ‘এপিক কার্ড’ চালুর দাবিতে। দাবি করা হয়, আজকের স্বচ্ছ নির্বাচনের নেপথ্যে রয়েছে সেই আন্দোলনের সাফল্য। কিন্তু এই দাবিকে ‘নির্লজ্জ মিথ্যাচার’ বলে অভিহিত করেছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

সেই সময়ের সংবাদপত্র এবং নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, উনিশশো তিরানব্বই সালের একুশে জুলাই যুব কংগ্রেসের ‘মহাকরণ অভিযান’-এর মূল দাবি ছিল—’আইনের শাসন অথবা রাষ্ট্রপতি শাসন।’ তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তাঁর দলের পক্ষ থেকে সেদিন ভোটার কার্ডের কোনো দাবিই উত্থাপন করা হয়নি। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, সেই আন্দোলনের সঙ্গে সচিত্র পরিচয়পত্রের কোনো যোগসূত্রই ছিল না।

বরং সত্যটি হলো, তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার টি এন শেষন দেশজুড়ে জাল ভোট রুখতে নিজস্ব প্রচেষ্টায় ‘এপিক কার্ড’ প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর সেই অদম্য লড়াইয়ের জন্যই ওই কার্ডের নাম হয়েছিল ‘শেষন কার্ড’। তিরানব্বই সালেই দেশব্যাপী এই ব্যবস্থার সূচনা হয়, যা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আন্দোলনের ফসল ছিল না।

বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্তমান দাবিগুলো ঐতিহাসিকভাবে ভিত্তিহীন। প্রশ্ন উঠছে, কেন হঠাৎ এই মিথ্যাচারের প্রয়োজন হলো? কেন রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে একুশে জুলাইয়ের আন্দোলনের রূপরেখা বদলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে? বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর মতে, এটি কেবল বিজেপির সমান্তরাল বয়ান তৈরির একটি কৌশল। কিন্তু তথ্যের সত্যতা যাচাই করলে দেখা যায়, এই বয়ান বাস্তবসম্মত নয়।

গণতন্ত্রের স্বার্থে ইতিহাসের সঠিক চর্চা প্রয়োজন। শহিদ দিবসের মতো একটি আবেগময় দিনকে ঘিরে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য ইতিহাসের পুনর্লিখন বা অসত্য প্রচার আদতে সেই শহিদদের আত্মত্যাগের অবমাননা কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকরা। প্রশাসনিক বিতর্ক আর রাজনৈতিক দড়ি টানাটানির ঊর্ধ্বে উঠে ইতিহাসের পাতায় যা লেখা আছে, তাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।