রাজনীতির আঙিনায় ভোজনরসিকদের আনাগোনা বা ‘খাবার কূটনীতি’ নতুন কিছু নয়। ইতিহাসের পাতায় বহু রুদ্ধদ্বার বৈঠক বা রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণের সাক্ষী থেকেছে নানা সুস্বাদু পদ। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গ তথা জাতীয় রাজনীতিতে এক অপ্রত্যাশিত ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হয়ে উঠেছে অতি সাধারণ ঝালমুড়ি। যে খাবার মূলত প্রান্তিক ও খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন ক্ষুধা মেটানোর মাধ্যম ছিল, আজ তা ভিভিআইপি মর্যাদা পেয়ে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।
সম্প্রতি দিল্লিতে এনডিএ-র মেগা বৈঠকে ঝালমুড়ির যে চিত্র দেখা গেল, তা রাজনৈতিক মহলে সাড়া ফেলে দিয়েছে। খোদ প্রধানমন্ত্রীর হাতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ঝালমুড়ির প্লেট তুলে দেওয়ার ঘটনা নেহাত কাকতালীয় বলে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই শুক্রবার নিউ টাউনের কনভেনশন সেন্টারে প্রধানমন্ত্রীর শাসনকালের একযুগ পূর্তির সাংবাদিক সম্মেলনে আমন্ত্রিতদের আপ্যায়নে পরিবেশন করা হলো ঝালমুড়ি। ঝাঁ-চকচকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এক্সিবিশন হলে মুড়ির এই সগর্ব উপস্থিতি বঙ্গ রাজনীতিতে চর্চার নতুন মোড় তৈরি করেছে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মশলা মাখানো ঝালমুড়ির জন্ম মূলত ব্রিটিশ শাসিত কলকাতায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কাজের সন্ধানে বাংলা, বিহার, ওড়িশা থেকে আসা অভিবাসী শ্রমিক এবং স্থানীয়দের মেলবন্ধনে এই খাবারের প্রসার ঘটে। তৎকালীন ব্রিটিশ সেনা ও সাধারণ মানুষের কাছে এটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে বহু দশক ধরে এই খাবারটি মূলত রেলের প্ল্যাটফর্ম বা রাস্তার মোড়েই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বদলেছে ছবিটা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরের অভিজাত অনুষ্ঠানে ঝালমুড়ির এই অনুপ্রবেশ আসলে এক সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ।
ক্ষমতাশালীরা তাঁদের শেকড়কে ভোলেননি—আমজনতার কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্যই মূলত ঝালমুড়িকে ব্যবহার করা হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে, এটি সমাজের নিচুতলার মানুষের সঙ্গে ক্ষমতার ভরকেন্দ্রের মানসিক দূরত্ব ঘোচানোর এক অভিনব প্রয়াস। ‘গরিবের খাবার’কে আভিজাত্যের মোড়কে পেশ করে রাজনৈতিক দলগুলি মাটির কাছাকাছি থাকার বার্তা দিতে চাইছে। তাই আজকের রাজনীতিতে ঝালমুড়ি কেবল তৃপ্তিদায়ক জলখাবার নয়, বরং তা জনসংযোগের এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও নিখুঁত রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ক্ষমতা আর সাধারণের মেলবন্ধনের এই নতুন স্বাদ এখন রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে।





