একই পরিবারের ১৩ শিশুর সলিলসমাধি, মায়েদের বুকফাটা আর্তনাদে স্তব্ধ গোটা এলাকা

উৎসবের আবহ ও খুশির আমেজ নিমেষেই ঢেকে গেল এক ভয়ঙ্কর এবং নির্মম ট্র্যাজেডিতে। বিহারের বৈশালী জেলার রাঘোপুরে গঙ্গা নদীতে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক নৌকা দুর্ঘটনা, যা গোটা রাজ্যকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। মাঝগঙ্গায় যাত্রীবোঝাই একটি নৌকা উল্টে গিয়ে এ পর্যন্ত ১৪ জনের সলিলসমাধির খবর পাওয়া গিয়েছে। সবচেয়ে করুণ ও মর্মান্তিক বিষয় হলো, মৃতদের মধ্যে অধিকাংশই নিষ্পাপ শিশু ও নাবালক। আরও হৃদয়বিদারক খবর, নিহতদের মধ্যে ১৩ জন শিশু একই পরিবারের সন্তান। জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত ওই নৌকায় আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ জন যাত্রী সওয়ার ছিলেন। তারা একটি নিকটবর্তী গ্রামে নিমন্ত্রণ বাড়িতে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথেই অপেক্ষা করছিল চরম কালরাত। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ নদীর মাঝপথে পৌঁছাতেই হঠাৎ করে নৌকাটি ভারসাম্য হারিয়ে জলে উল্টে যায়।
ঘটনার বিকট শব্দ ও আকুল চিৎকার শুনে মুহূর্তের মধ্যেই চাঞ্চল্য ছড়ায় গোটা এলাকায়। খবর পাওয়া মাত্রই দুর্ঘটনাস্থলে তড়িঘড়ি পৌঁছায় বিশাল পুলিশ বাহিনী ও বিপর্যয় মোকাবিলা দল (SDRF)। স্থানীয় গ্রামবাসীরাও প্রশাসনের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নদীর তীব্র স্রোত সামলে রাতের অন্ধকারেই শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। এ পর্যন্ত বহু লোককে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনও কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাঁদের খোঁজে নদীতে তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, জল থেকে উদ্ধার করা আহতদের দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নদীপাড়ে যে দৃশ্য দেখা গিয়েছে, তা চোখে দেখা যায় না। স্বজনহারা ও সন্তানহারা মায়েদের বুকফাটা আর্তনাদে গঙ্গার পাড় ভারী হয়ে ওঠে। কোল খালি হওয়া মায়েরা কখনও শূন্য দৃষ্টিতে নদীর দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করছেন, কখনও বা বুক চাপড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে ঘটনাস্থলে আসা জেলাশাসক বর্ষা সিংকে আঁকড়ে ধরে মায়েদের সেই করুণ আকুতি দেখে জল ধরে রাখতে পারেননি সেখানে উপস্থিত কোনো মানুষই। একই পরিবারের ১৩টি ফুটফুটে শিশুর আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো গ্রাম যেন এক লহমায় শ্মশানে পরিণত হয়েছে। এক লহমায় ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে কয়েকটি পরিবারের সমস্ত স্বপ্ন ও আশা-আকাঙ্ক্ষা।
প্রাথমিক তদন্ত ও স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত ওই পুরনো নৌকাটিতে একটি ছোট ছিদ্র ছিল। যাত্রীদের অজান্তেই মাঝনদীতে সেই ছিদ্র দিয়ে হু হু করে জল ঢুকতে শুরু করে। জলের ভারে সামঞ্জস্য রাখতে না পেরে মুহূর্তের মধ্যে পুরো নৌকাটি তলিয়ে যায়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধরী। নিহতদের পরিবার পিছু ৪ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করে তিনি বলেন, “বৈশালীর এই দুর্ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ঈশ্বর মৃতদের আত্মাকে শান্তি দিন এবং পরিজনদের এই অসীম কষ্ট সহ্য করার শক্তি দিন।” অন্যদিকে, স্থানীয় বিধায়ক ও আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত ত্রাণ, উদ্ধার ও যথাযথ চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছেন।