‘এই ক্ষত পূরণ হওয়ার নয়!’-মেসির ‘লাস্ট ডান্স’-এর স্বপ্নভঙ্গ, ম্যাচ হেরে কী বললেন ফুটবলের বরপুত্র?

কথায় আছে, শেষ ভাল যাঁর, সব ভাল তাঁর। কিন্তু ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসির ফুটবল জীবনের শেষটা আশানুরূপ হল না। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আজীবন মনে রাখার মতো স্বপ্নপূরণ হলেও, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে নীল-সাদা জার্সিতে জীবনের শেষ ম্যাচে সেই স্বপ্নকে দ্বিতীয়বার বাস্তব রূপ দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হল। ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে গিয়ে করুণভাবে ভাঙল মেসির বহুচর্চিত ‘লাস্ট ডান্স’-এর স্বপ্ন। হারের পর চরম হতাশা প্রকাশ করে লিও মেসি সাফ জানিয়েছেন, “এই ক্ষত পূরণ হওয়ার নয়।”
ফাইনালের হার ও মেসির আবেগঘন বার্তা
টানা তৃতীয়বারের মতো দলকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলে আনা অধিনায়ক মেসির গলায় অবশ্য সতীর্থদের জন্য গর্বের সুরই শোনা গেছে। বিশ্বকাপ ফাইনাল হারের ঠিক একদিন পর ইনস্টাগ্রামে একটি দীর্ঘ ও আবেগঘন পোস্ট করেন তিনি। পরাজয়ের এই গ্লানি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে বলে জানান মেসি। তবে গোটা টুর্নামেন্টে দলের সাফল্যকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখতে নারাজ তিনি।
মেসি তাঁর পোস্টে লেখেন:
“এই ক্ষত গভীর। অনেকটা সময় লাগবে এই ক্ষত সারতে। তবে যা কিছু ভাল, তা নিয়েই থাকতে চাই আমি। যে ম্যাচগুলি জিততে আমরা নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছিলাম, তা স্মৃতিতে থাকবে আজীবন। গোটা দেশের সমর্থন, সকলের অক্লান্ত পরিশ্রম, এই টিমের প্রচেষ্টা—এই সবের কারণেই আমরা এবার ফের সেরা টিমগুলোর অন্যতম হতে পেরেছি। অস্বীকার করার উপায় নেই, এই টিমই পরপর দুবার বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছে।”
আর্জেন্টিনা দলকে নাগাড়ে সমর্থন জুগিয়ে যাওয়ার জন্য দেশের ফ্যানেদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি স্পেনকেও কাপ জয়ের জন্য অভিনন্দন জানান।
ফাইনালের লড়াই ও স্পেনের নিখুঁত ছক
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এবারের বিশ্বকাপ শুরু করা মেসিদের এই সফরটা সহজ ছিল না। নকআউট পর্বের প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা টপকে ফাইনালে পৌঁছেছিল আলবিসেলেস্তেরা। রাউন্ড অফ ১৬-তে দুই গোল পিছিয়ে থেকেও মিশরের বিরুদ্ধে দুরন্ত কামব্যাক বা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নাটকীয় জয়—সবক্ষেত্রেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মেসি।
কিন্তু ফাইনালের মঞ্চে লুই দে লা ফুয়েন্তের শক্তিশালী স্প্যানিশ আর্মাডা মেসিদের সেই জয়রথ আটকে দেয়। ম্যাচে মেসিকে বিপজ্জনক এলাকায় কড়া ‘ম্যান মার্কিং’-এ বন্দি করে রাখে স্পেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে (১১৬ মিনিটে) বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নেমে ত্রাতা হয়ে ওঠেন ফেরান তোরেস। তাঁর করা একমাত্র গোলেই ১৬ বছর পর বিশ্বমুকুট জয় করে স্পেন।
চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান ও স্পেনের আধিপত্য
এই ফাইনালের একটি পরিসংখ্যান আর্জেন্টিনার চরম লড়াই ও অসহায়ত্বের চিত্রটি স্পষ্ট করে দিয়েছে:
গোটা বিশ্বকাপ ফাইনালের ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনা গোলে একটিও শট নিতে পারেনি, যা বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথম।
গোলমুখে বা জালের বাইরে তাদের প্রথম শটটি এসেছিল ম্যাচের ১১৬তম মিনিটে! ততক্ষণে তারা ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ায় ১০ জনে নেমে এসেছে।
ফাইনালে মেসির ওপর আর্জেন্টিনার অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাই কাল হয়ে দাঁড়ায়। ৩৯ বছর বয়সি তারকাকে স্বাভাবিক খেলা খেলতে দেয়নি স্পেনের রক্ষণ।
অন্যদিকে, স্পেনের বেঞ্চের গভীরতা ও কৌশল ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়। বদলি নেমে ফেরান তোরেস এবং নিকো উইলিয়ামস শেষ মুহূর্তে গতির ঝড় তুলে আর্জেন্টিনার রক্ষণ চূর্ণ করেন। ম্যাচের পর স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বলেন, “এমিলিয়ানো মার্তিনেজের একের পর এক দুর্দান্ত সেভের কারণেই আমাদের জয় পেতে কিছুটা দেরি হয়েছে। তবে এটা বিশ্বকাপের ফাইনাল, আমরা সব পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুত ছিলাম।” সারা টুর্নামেন্টে ৮টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট করে আগুন ঝরালেও, জীবনের শেষ বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে না পারার একরাশ আক্ষেপ নিয়েই মাঠ ছাড়লেন ফুটবলের রাজপুত্র।