সাপের কামড়ে ১১ কোটির হাসপাতালের বিল! ভারতে এমন ঘটনা ঘটলে হেলথ ইনস্যুরেন্স কি পুরো টাকা দেবে?

বর্ষাকাল মানেই চারদিকে বৃষ্টির জাঁকজমক, তবে এই ঋতুতেই আবার দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাপের কামড়ে আহত হওয়া কিংবা মৃত্যুর মর্মান্তিক খবর প্রায়ই সামনে আসে। একটানা বৃষ্টির জেরে নিচু জায়গা জলমগ্ন হয়ে পড়ায় সাপেরা বাধ্য হয়ে তাদের ভূগর্ভস্থ গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে আসে এবং অনেক সময় লোকালয়ে কিংবা মানুষের বাড়িঘরে ঢুকে পড়ে। এছাড়া মাঠে-ঘাটে কাদাজলে কাজ করা খেতমজুর বা কৃষকদের ক্ষেত্রেও সাপের কামড়ের ঝুঁকি সবথেকে বেশি থাকে। সরকারি হাসপাতালে সাধারণত সাপের বিষের প্রতিষেধক বা অ্যান্টিভেনম মজুত থাকলেও বহু ক্ষেত্রে তা সময়মতো পাওয়া যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গেলে বিপুল খরচের মুখে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। আর তখনই মনে প্রশ্ন জাগে, এই চিকিৎসার খরচ কি স্বাস্থ্যবিমা বহন করবে? কিংবা সাপের কামড়ে মৃত্যু হলে টার্ম ইন্স্যুরেন্স বা জীবনবিমা থেকে পরিবার কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবে কি না?
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আমেরিকায় ঘটা একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে এক ব্যক্তিকে দু’বার সাপ কামড়ানোর পর তাঁর শরীর থেকে বিষের মারাত্মক প্রভাব কাটাতে মোট ৫৪টি অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন দিতে হয়েছিল। এর ফলে ওই রোগীর চিকিৎসায় হাসপাতালের পক্ষ থেকে প্রায় ১১ কোটি টাকার বিল ধরানো হয়। এই লোমহর্ষক ঘটনার পর থেকেই ভারতীয় মধ্যবিত্তের মনে প্রশ্ন জাগছে যে, ভারতে যদি এমন দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে কি স্বাস্থ্যবিমা সংস্থাগুলি চিকিৎসার এই আকাশছোঁয়া খরচ বহন করবে? এই বিষয়ে বিমা বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রায় অধিকাংশ স্বাস্থ্যবিমা সংস্থাই তাদের মূল পলিসির সাথে পার্সোনাল অ্যাক্সিডেন্ট বা ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা কভারেজ প্রদান করে থাকে। এটি সাধারণ রোগভোগের কভারেজের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং এর ক্ষেত্রে সাধারণত কোনো ধরনের অপেক্ষার সময় বা ওয়েটিং পিরিয়ড থাকে না।
সাপের কামড় খাওয়ার পর যদি রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়, তবে অধিকাংশ স্ট্যান্ডার্ড স্বাস্থ্যবিমা পলিসির আওতায় হাসপাতালের বেড ভাড়া, মহার্ঘ অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে আইসিইউ-তে চিকিৎসার সমস্ত খরচই বিমা সংস্থা পরিশোধ করে থাকে। ঠিক একইভাবে, শুধু স্বাস্থ্যবিমা নয়, বহু জীবনবিমা পলিসিতেও দুর্ঘটনাজনিত কভারেজের আওতায় সাপের কামড়ে মৃত্যু হলে নমিনিকে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে সাপের কামড়কে আকস্মিক দুর্ঘটনা হিসেবেই গণ্য করা হয়, তাই পলিসির সমস্ত নিয়ম ও শর্ত পূরণ হলে খুব সহজেই বিমার টাকা দাবি করা সম্ভব। পাশাপাশি, উত্তরপ্রদেশসহ দেশের বিভিন্ন রাজ্য সরকারও সাপের কামড়ে মৃত্যুর ক্ষেত্রে সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। যেমন, উত্তরপ্রদেশ সরকার মৃত ব্যক্তির পরিবারকে চার লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে থাকে, যার জন্য চিকিৎসকের রিপোর্টের পাশাপাশি পুলিশে দায়ের করা এফআইআর-এর কপি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
অন্যদিকে, টার্ম ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রেও সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সাপের কামড়ে মৃত্যু কভার করা হয়ে থাকে। যদিও টার্ম পলিসিতে যুদ্ধ, দাঙ্গা বা নাশকতার মতো কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বাদ দেওয়া হয় এবং কিছু প্রি-এক্সিসটিং রোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ওয়েটিং পিরিয়ড থাকতে পারে, তবে সাপের কামড়ের মতো অপ্রত্যাশিত ঘটনার ক্ষেত্রে কোনো ওয়েটিং পিরিয়ড কার্যকর হয় না। দুর্ঘটনাজনিত জরুরি পরিস্থিতির আওতায় এটি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে। তবে এই সমস্ত ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষভাবে মাথায় রাখা প্রয়োজন। অনেক সময় কিছু কড়া বিমা সংস্থা সাপের কামড়ের স্পষ্ট ক্ষতচিহ্ন শরীরে না দেখতে পেলে গ্রাহকের দাবি খারিজ করতে পারে, এমনকি ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্টেও যদি মৃত্যুর কারণ হিসেবে সাপের কামড় উল্লেখ থাকে, তবুও এই জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই যেকোনো ধরনের অনভিপ্রেত বিপদের ঝুঁকি এড়াতে বিমার দাবি পেশ করার সময় চিকিৎসকের স্বাক্ষরিত বিশদ রিপোর্ট এবং থানার এফআইআর-এর কপি অত্যন্ত যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা উচিত।