এআই-এর দাপটে চাকরি হারাচ্ছেন লক্ষাধিক কর্মী! ২০২৬-এ বিশ্বজুড়ে কোন কোন সংস্থায় আসছে ছাঁটাইয়ের সুনামি?

বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থানের বাজারে ফের একবার বড়সড় ধস নেমেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি, ব্যবসায়িক কাঠামোর ব্যাপক পুনর্গঠন এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কারণে বিশ্বের একাধিক শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক সংস্থা ফের গণছাঁটাইয়ের পথ বেছে নিয়েছে। আমাজন, মেটা, ওরাকল এবং ওয়ালমার্টের মতো আন্তর্জাতিক নামী প্রতিষ্ঠানগুলি চলতি ২০২৬ সালে ইতিমধ্যেই তাদের কর্মী সংখ্যা বড় পরিমাণে ছাঁটাই করার চূড়ান্ত ঘোষণা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান সময়ের এই ব্যাপক ছাঁটাইয়ের অন্যতম প্রধান এবং ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে এআই প্রযুক্তির অত্যন্ত দ্রুত বিস্তার। অধিকাংশ কর্পোরেট সংস্থা মনে করছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিখুঁত সাহায্য নিয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক কম সংখ্যক কর্মী দিয়েই আগের তুলনায় বহুগুণ বেশি কাজ হাসিল করা সম্ভব। ফলস্বরূপ, মানব শ্রমের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া বহু জটিল ও দাপ্তরিক কাজ এখন এআই এবং আধুনিক অটোমেশন প্রযুক্তি একাই অত্যন্ত সফলভাবে সামলে নিচ্ছে।
বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত সংস্থার প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে যে, এআই ব্যবহারের ফলে তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কর্মী কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। তবে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই একমাত্র কারণ নয়, বরং ব্যবসার মন্থর গতি, বৈশ্বিক বাজারের চাহিদার প্রতিনিয়ত পরিবর্তন, সামগ্রিক খরচ কমানো এবং নতুন ব্যবসায়িক কৌশল গ্রহণের জন্যও বিভিন্ন কোম্পানি কর্মী সংখ্যা কমাচ্ছে। বহু প্রতিষ্ঠান তাদের পুরনো ও জটিল কাঠামোকে সরল করে সরাসরি প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে।
চলতি কর্মী ছাঁটাইয়ের তালিকায় থাকা কিছু প্রধান সংস্থার চিত্র দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়:
• ইউপিএস (UPS): নেটওয়ার্কের ব্যাপক পুনর্গঠন এবং খরচ কমানোর লক্ষ্যে প্রায় ৩০,০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের বিশাল পরিকল্পনা করেছে।
• ওরাকল (Oracle): এআই প্রযুক্তির সফল গ্রহণ এবং ব্যবসায়িক পুনর্গঠনের কারণে প্রায় ২১,০০০ কর্মী, অর্থাৎ তাদের মোট কর্মীবাহিনীর প্রায় ১৩ শতাংশ ছাঁটাই করছে।
• সিটি (Citi): এক ধাক্কায় প্রায় ২০,০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
• আমাজন (Amazon): কর্পোরেট স্তরে কাজের গতিশীলতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রায় ১৬,০০০ চাকরি কমানো হচ্ছে।
• ডেল (Dell): প্রায় ১১,০০০ কর্মীকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে।
• এস্তে লডার (Este Lauder): অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রায় ১০,০০০ চাকরি ছাঁটাই করা হচ্ছে।
• ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো: প্রায় ৯,০০০ পদ বাতিলের কঠোর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
• হিনেকেন (Heineken): ৫,০০০ থেকে ৬,০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা করেছে।
• ভিসা (Visa): এআই-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার দিকে ঝোঁকার কারণে প্রায় ২,৬০০ চাকরি কমানো হচ্ছে।
• অ্যাটলাসিয়ান (Atlassian): প্রায় ১,৬০০ কর্মী ছাঁটাই করে সেই অর্থ সরাসরি এআই খাতে বিনিয়োগ করছে।
• নাইকি (Nike): প্রায় ১,৪০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে পা বাড়িয়েছে।
• ক্লাউডফ্লেয়ার (Cloudflare): ১,১০০-এর বেশি অর্থাৎ তাদের মোট কর্মীবাহিনীর প্রায় ২০ শতাংশ কর্মী কমানোর কথা ঘোষণা করেছে।
বিভিন্ন অর্থনৈতিক গবেষণা রিপোর্টে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, বর্তমানের এই কর্মী ছাঁটাইয়ের সংখ্যা হয়তো এক বৃহত্তর ও ভয়াবহ প্রবণতার কেবল প্রাথমিক সূচনা মাত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যে ১০০টিরও বেশি সংস্থা সরকারি দপ্তরে ছাঁটাইয়ের আনুষ্ঠানিক নোটিস জমা দিয়েছে। সাধারণত বড় ধরনের গণছাঁটাই বা বড় কোনো উৎপাদন কারখানা চিরতরে বন্ধ করার ঠিক আগেই এই ধরনের নোটিস বাধ্যতামূলকভাবে প্রদান করা হয়ে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে চাকরি হারানোর পেছনে মূলত প্রধান তিনটি কারণ অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে—
১. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং অটোমেশনের অতি দ্রুত ব্যবহার ও বিস্তার।
২. বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ সরকারি নীতির আকস্মিক পরিবর্তন।
৩. বৈশ্বিক অর্থনীতির চরম অনিশ্চয়তা এবং সাধারণ গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা ও চাহিদার রূপান্তর।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বা ডব্লিউইএফ-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪১ শতাংশ সংস্থাই আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এআই প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে তাদের কর্মী সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে ছাঁটাই করার সম্ভাবনা দেখছে। ফলস্বরূপ, আগামী দিনের প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে সাধারণ দক্ষতার পাশাপাশি বিশেষায়িত এআই প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করা চাকরিপ্রার্থীদের জন্য আরও বেশি অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে।