একজন বিবাহিত হিন্দু মহিলা যদি কোনো উইল (Will) না করে প্রয়াত হন এবং সেই সময়ে তাঁর স্বামী বা সন্তান কেউই জীবিত না থাকেন, তবে তাঁর সম্পত্তি কার হাতে যাবে? সাধারণ মানুষের ধারণা, এই সম্পত্তির প্রকৃত দাবিদার তাঁর বাবা-মা। কিন্তু বাস্তবের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আইনি জটিলতায় ভরা। ভারতীয় হিন্দু উত্তরাধিকার আইন (Hindu Succession Act) অনুযায়ী, মহিলার সম্পত্তির উত্তরাধিকার নির্ভর করে সম্পত্তিটি তিনি কীভাবে অর্জন করেছিলেন তার ওপর।
সম্পত্তির উৎস অনুযায়ী উত্তরাধিকারের নিয়ম:
১. স্ব-উপার্জিত সম্পত্তি: যদি কোনো মহিলা নিজের উপার্জিত অর্থ বা আয়ের মাধ্যমে কোনো সম্পত্তি কেনেন, তবে তাঁর অবর্তমানে প্রথম অধিকার থাকে স্বামী ও সন্তানদের। কিন্তু তাঁরা না থাকলে, আইন অনুযায়ী সেই সম্পত্তি মহিলার বাবা-মায়ের কাছে যাওয়ার সুযোগ নেই। তার পরিবর্তে, সেই সম্পত্তির মালিকানা চলে যাবে মহিলার স্বামীর আত্মীয়দের (যেমন—শ্বশুর-শাশুড়ি, দেওর বা ভাসুর) হাতে। মজার বিষয় হলো, মহিলার বাবা-মায়ের স্থান এই তালিকায় তৃতীয় বা একেবারে শেষে।
২. বাবা-মায়ের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি: যদি সম্পত্তিটি কোনো মহিলা তাঁর বাবা-মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকেন, তবে নিয়মটি ভিন্ন। এক্ষেত্রে স্বামী বা সন্তান না থাকলে, সম্পত্তিটি আবার মহিলার বাবার বংশের উত্তরাধিকারীদের কাছেই ফিরে যাবে। এখানে স্বামীর পরিবারের কোনো দাবি খাটে না।
৩. স্বামী বা শ্বশুরের থেকে প্রাপ্ত সম্পত্তি: যদি কোনো মহিলা তাঁর স্বামী বা শ্বশুরের কাছ থেকে কোনো সম্পত্তি পেয়ে থাকেন, তবে সেই ক্ষেত্রে স্বামী বা সন্তান না থাকলে, তা আবার স্বামীর আইনগত উত্তরাধিকারীদের কাছেই ফিরে যাবে।
আইনি বৈষম্য ও বর্তমান বিতর্ক:
বর্তমান আইনে লিঙ্গভিত্তিক একটি বড় বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। কোনো হিন্দু পুরুষ উইল না করে মারা গেলে, তাঁর মা ‘প্রথম শ্রেণির উত্তরাধিকারী’ (Class-1 heir) হিসেবে গণ্য হন। অথচ মহিলাদের ক্ষেত্রে তাঁর বাবা-মাকে উত্তরাধিকারের তালিকার একেবারে শেষে রাখা হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক নিয়মটি নিয়ে আইনজ্ঞদের মহলে তীব্র সমালোচনা রয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন।
উইল করা কেন জরুরি:
এই জটিল আইনি পরিস্থিতির হাত থেকে মুক্তি পেতে এবং নিজের উপার্জিত সম্পদের সঠিক উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে মহিলাদের জন্য উইল করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বিশেষত অবিবাহিতা, বিধবা, ডিভোর্সি কিংবা যাঁদের বাবা-মা তাঁদের ওপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল, তাঁদের ক্ষেত্রে উইল করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। উইল না থাকলে বাপের বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ির মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী আইনি লড়াই, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হস্তান্তরে জটিলতা, এমনকি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হয়ে যাওয়ার ফলে বয়স্ক বাবা-মায়ের চরম আর্থিক সংকটে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া গয়না, পারিবারিক ব্যবসা বা ডিজিটাল সম্পত্তি নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধ এড়াতে উইলই একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ। আইনের মারপ্যাঁচ থেকে বাঁচতে এবং নিজের প্রিয়জনদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে আজই সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে উইল করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।





