‘আর নোট ফাটবে না, ময়লাও হবে না!’ ভারতে এবার আসছে প্লাস্টিকের টাকা, রিজার্ভ ব্যাংকের মেগা ঘোষণায় তোলপাড়

ভারতের আর্থিক ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী বদল আনতে চলেছে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI)। দীর্ঘ জল্পনার অবসান ঘটিয়ে এবার প্রচলিত সুতি-ভিত্তিক কাগজের নোটের পরিবর্তে পলিমার বা বিশেষ প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি নোট চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রাথমিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া ১০ ও ২০ টাকার নোট দিয়ে এই পরীক্ষামূলক বা ট্রায়াল রান শুরু হতে চলেছে। বিশ্বজুড়ে ৪০টিরও বেশি দেশ ইতিমধ্যেই পলিমার মুদ্রা সফলভাবে ব্যবহার করছে এবং ভারতও সেই আধুনিক তালিকার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পথে জোরালো পদক্ষেপ ফেলল।
‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’-র সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আরবিআই এমন সব উন্নত প্রস্তুতকারক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আগ্রহপত্র বা এক্সপ্রেশন অফ ইন্টারেস্ট (EOI) আহ্বান করেছে, যারা আন্তর্জাতিক মানের বিশেষ পলিমার সাবস্ট্রেট শিট সরবরাহ করতে সম্পূর্ণ সক্ষম। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এখনও দেশজুড়ে সমস্ত কাগজের নোট রাতারাতি প্রতিস্থাপনের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি। প্রচলিত ভারতীয় ব্যাঙ্কনোটগুলো এতদিন সুতি বা কটন ফাইবারের কাগজে ছাপা হলেও, নতুন এই পলিমার নোটগুলো তৈরি হবে বিশেষ এক ধরনের প্লাস্টিক ফিল্ম বা ‘বাইএক্সিয়ালি ওরিয়েন্টেড পলিপ্রোপিলিন’ (BOPP) দিয়ে। এই নোটগুলো ছোঁয়া মাত্র এক অদ্ভুত মসৃণ ও প্লাস্টিকের মতো অনুভূতি দেবে। পাশাপাশি, এতে অত্যন্ত আধুনিক স্বচ্ছ অংশ বা উইন্ডো, জটিল হলোগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য এবং বিশেষ কালি যুক্ত করা সম্ভব হবে, যা কোনোভাবেই জাল বা নকল করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশগুলো বহু বছর আগেই এই প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
কিন্তু হঠাৎ কেন প্লাস্টিকের নোট আনার এমন মরিয়া উদ্যোগ নিল আরবিআই? এর পেছনে রয়েছে একাধিক বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক কারণ। প্রথমত, কাগজের নোটের তুলনায় পলিমার নোট দুই থেকে চার গুণ বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিশেষ করে ১০ ও ২০ টাকার মতো কম মূল্যের নোটগুলো প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের হাতবদল হয় এবং খুব দ্রুত নোংরা বা ছিঁড়ে যায়। পলিমার নোট আর্দ্রতা ও ময়লা শোষণ করে না, ফলে তরল পদার্থ পড়লেও তা নষ্ট হয় না এবং সাবান-জল দিয়ে সহজেই পরিষ্কার করা যায়। দ্বিতীয়ত, জালিয়াতি ও নকল নোটের রমরমা বাজার পুরোপুরি রুখে দিতে এই প্লাস্টিকের নোটে অসম্ভব নিখুঁত নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য যোগ করা সম্ভব। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা বা কারেন্সি ম্যানেজমেন্টের খরচ হু হু করে কমিয়ে আনবে এই পলিমার কারেন্সি। কারণ বারবার নতুন নোট ছাপানোর খরচ থেকে রেহাই পাবে ব্যাংক।
উল্লেখ্য, এটি আরবিআই-এর প্রথম কোনো অন্ধ প্রচেষ্টা নয়। এর আগে ২০১৩ এবং ২০১৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু নির্দিষ্ট শহরে ১০ টাকার পলিমার নোট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে সম্পূর্ণ রূপ পায়নি। তবে এবারের পদক্ষেপটি অনেক বেশি সুদূর প্রসারী ও আমূল পরিবর্তন আনতে চলেছে। যেহেতু কম দামের নোটগুলোর মাধ্যমেই দেশের দৈনন্দিন অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি গতিশীল থাকে, তাই সেগুলোকে দিয়েই এই মেগা প্রজেক্টের সূচনা হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত, বর্তমানের কাগজের নোটগুলোর আইনি বৈধতা এখনই বাতিল হচ্ছে না। পরীক্ষামূলক প্রকল্পের শতভাগ সাফল্য এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়নের পরই কেবল ধাপে ধাপে পুরো দেশে এই ভবিষ্যৎমুখী পলিমার মুদ্রা প্রবর্তন করা হবে।