আকাশ ছোঁয়া দূষণে কড়া পদক্ষেপ! আন্তর্জাতিক বিমানগুলির জন্য কার্বন তথ্য জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করল DGCA

ভারতের অসামরিক বিমান পরিবহণ জগতের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ করতে চলেছে দেশের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিসিএ (DGCA)। আন্তর্জাতিক স্তরে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক চুক্তি পালনের লক্ষ্যে খুব শীঘ্রই একটি নতুন এবং কঠোর নিয়ম চালু করা হচ্ছে। এই নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সমস্ত বিমান সংস্থাকে ভারতের যেকোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পরিচালিত তাদের আন্তর্জাতিক উড়ানগুলির বার্ষিক কার্বন নিঃসরণের অন্তত ৯০ শতাংশ নির্ভুল তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে জমা দিতে হবে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো সমস্ত বিমান সংস্থার জন্য একই রকম নিয়মের বেড়াজাল বজায় রাখা এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক বৈষম্য তৈরি না হয়, তা সুনিশ্চিত করা।

আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহণ খাতের জন্য কার্বন নিঃসরণ হ্রাস সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি ‘কোরসিয়া’ (CORSIA)-র নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলার জন্যই ভারত বর্তমানে এই সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রী রাম মোহন নাইডু পরিবেশবান্ধব বিমান জ্বালানি বা ‘টেকসই এভিয়েশন ফুড’ (Sustainable Aviation Fuel বা SAF) সম্পর্কিত একটি অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সম্পন্ন করেছেন। ওই বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, ভারত সরকার নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই আন্তর্জাতিক উড়ানের জ্বালানিতে পরিবেশবান্ধব উপাদান ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সম্পূর্ণরূপে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রয়েছে।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, ভারত সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক উড়ানের জন্য ব্যবহৃত মোট জ্বালানির সঙ্গে অন্তত ১ শতাংশ এসএএফ (SAF) মেশানোর আন্তর্জাতিক লক্ষ্যমাত্রায় আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মত হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই লক্ষ্যমাত্রা পরবর্তীতে ধাপে ধাপে আরও বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সেই অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে এই মিশ্রণের মাত্রা বাড়িয়ে ২ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৫ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ তেল বিপণন সংস্থাগুলি (OMCs) বর্তমানে দেশীয় প্রযুক্তিতে এসএএফ উৎপাদনে নিজেদের নিয়োজিত করেছে। বিশেষ করে পানিপত এবং মুম্বইয়ের প্রধান শোধনাগারগুলিতে এই বিশেষ পরিবেশবান্ধব জ্বালানি তৈরির কাজ বর্তমানে একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাশাপাশি, সরকারি খাতের পাশাপাশি দেশের বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও এসএএফ উৎপাদনে এগিয়ে আসার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে।

এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এসএএফ-এর সাপ্লাই চেন, উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা, আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন এবং আইসিএও (ICAO) ও কোরসিয়া (CORSIA)-র নির্দেশিকা মেনে সঠিক রিপোর্টিং কাঠামো তৈরির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। উক্ত বৈঠকে অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক ছাড়াও পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের শীর্ষ আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ডিজিসিএ, বিভিন্ন বিমান সংস্থা, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং দেশের প্রধান তেল বিপণন সংস্থাগুলির উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরাও এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

বর্তমানে ভারতে এসএএফ সংক্রান্ত খসড়া নীতিটি চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো, সাধারণ বিমানযাত্রী কিংবা উড়ান সংস্থাগুলির ওপর অতিরিক্ত কোনো আর্থিক বোঝা বা টিকিটের দাম বৃদ্ধির চাপ না চাপিয়েই এই ১ শতাংশ মিশ্রণের লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে অর্জন করা। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক কোরসিয়া (CORSIA)-র বাধ্যতামূলক পর্ব আগামী ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হতে চলেছে। কার্বন নিঃসরণের সুনির্দিষ্ট তথ্য জমা দেওয়ার এই নতুন কড়া নিয়ম এবং দেশজুড়ে এসএএফ উৎপাদন বাড়ানোর এই সময়োপযোগী উদ্যোগ ভারতের এভিয়েশন সেক্টরকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে এবং বিশ্বজুড়ে পরিবেশ দূষণ হ্রাসের মহৎ উদ্যোগে সক্রিয় অংশীদার হতে বিশেষভাবে সহায়তা করবে।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty