সরকার বদলাতেই উধাও আস্ত সাম্রাজ্য! টুলু মণ্ডলের ‘পাথরসম্রাট’ হয়ে ওঠার চাঞ্চল্যকর ও ভয়ঙ্কর কাহিনী জানলে চোখ কপালে উঠবে!

মাথায় ঝুড়ি চাপিয়ে লরিতে পাথর বোঝাই করার সাধারণ এক দিনমজুর থেকে কীভাবে রাতারাতি আস্ত এক সাম্রাজ্যের মালিক তথা এলাকার সর্বেসর্বা ‘পাথরসম্রাট’ হয়ে উঠলেন টুলু মণ্ডল? বর্তমানে এই প্রশ্নই এখন সর্বোত্তম চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের উচ্চপর্যায়ের তদন্তে একের পর এক ভয়ঙ্কর ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে উঠে আসছে, যা দেখে রীতিমতো স্তম্ভিত সকলে। এলাকায় টুলু মণ্ডলের নির্দেশ ছাড়া যেন গাছের পাতাও নড়ত না। তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য দেখে অনেকেই বলতেন, টুলু মণ্ডল মানেই যেন এক স্বাধীন সমান্তরাল প্রশাসন বা আস্ত একটা সরকার। এই প্রবল ক্ষমতার জোরেই নদী দখল করে রাস্তা তৈরি করতেও সামান্যতম দ্বিধাবোধ করেননি এই প্রভাবশালী পাথর ব্যবসায়ী। এখানেই শেষ নয়, তাঁর পরিকল্পনা ছিল নদীর ওপর আস্ত একটা সেতু বানিয়ে ফেলার এবং সেই বেআইনি রাস্তায় গাড়ি চলাচলের জন্য নিয়মিত টোল ট্যাক্স আদায় করাও শুরু হয়েছিল।
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের শুরুর দিকে। সেই সময় তিলপাড়া ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, জরুরি মেরামতির কাজের জন্য ময়ূরাক্ষী নদীর ওপরের প্রধান সেতুটি কয়েকদিন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হবে। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে তীব্র বিপাকে পড়ে যায় টুলু অ্যান্ড কোম্পানি। সেতু বন্ধ থাকলে তাদের শত শত পাথরের লরি বেরোবে কোন বিকল্প পথে? এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে একেবারে সাংবাদিক বৈঠক ডেকে বসেন খোদ টুলু মণ্ডল এবং নিজে হাতে সেতু তৈরির বোমা ফাটানো পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। সেই সময়ের এক সাংবাদিক বৈঠকে তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘তিলপাড়ার যে ব্রিজ, এপ্রিল থেকে মনে হয় এই ব্রিজটায় যান চলাচল বন্ধ আছে। তো আমরা যে দুর্গতিতে পড়ে গেছি আমাকে বলেছে এবং ঊর্ধ্বতন আমাদের যা প্রশাসন আছে, বলল আপনারা থেকে এটা করে দেন। আমি কাজলকে বলেছি যেহেতু কাজল সঙ্গে আছে, এবং অনেক লোকাল লোকের, ৯ জন লোকাল লোকের জায়গা আছে, তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে এটা বানিয়ে দিতে। এটা বানাতে মোটামুটি ৪-৫ কোটি টাকা খরচ হবে।’
নতুন সেতু তৈরির কাজ শুরু হওয়ার আগে ভারী গাড়ি চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে নদীর বুকে হিউম পাইপ ফেলে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে একটি বিকল্প রাস্তা তৈরি করে ফেলা হয়। শুধু তাই নয়, সেই বিতর্কিত রাস্তার জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনও করেছিলেন খোদ টুলু মণ্ডল। এলাকার সাধারণ মানুষ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা আতঙ্কের সুরে জানান যে, টুলুই ছিলেন এলাকার শেষ কথা এবং অলিখিত সরকার। স্থানীয় এক বাসিন্দা সাফ জানান, এটা সম্পূর্ণ একটা নদী। কিন্তু হঠাত শোনা গেল নদীর ওপর ব্রিজ হবে, রাস্তা হবে এবং টুলু মণ্ডল নিজে এসে তার উদ্বোধন করবে। এরপর শুরু হয় সেতু নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ। নদীর পাড়ে নিয়ে আসা হয় বিশালাকার সব কংক্রিটের সেগমেন্ট এবং উচ্চমানের নির্মাণসামগ্রী। সেই সময় সাংবাদিক সম্মেলনে টুলু অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সুরে জানিয়েছিলেন যে এই সেতুটি হবে একেবারে বিশ্বমানের। তাঁর কথায়, এটি অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির হবে এবং যে বড় বড় ব্লকগুলো পড়ে আছে তার ওপরে প্রায় কুড়ি থেকে পঁচিশ টন রড দিয়ে পাকা ঢালাই করা হবে। এ গ্রেডের ওপিসি সিমেন্ট ব্যবহার করে মাত্র পনেরো দিনের মধ্যে এই সেতু সাধারণের জন্য চালু করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল।
তবে নিয়তির নির্মম পরিহাসে এবং রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তনের জেরে শেষপর্যন্ত ভেস্তে যায় টুলু মণ্ডলের সেই স্বপ্নের সেতু তৈরির পরিকল্পনা। আকস্মিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও তাঁর গোপন সম্পত্তি ও অবৈধ সাম্রাজ্যের আসল চিত্র জনসমক্ষে চলে আসতেই গা ঢাকা দিয়েছেন দাপুটে পাথরসম্রাট টুলু মণ্ডল। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গেই খুলে দেওয়া হয়েছে তিলপাড়া ব্যারাজের মূল দরজাও, আর তার জেরে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে টুলুর সেই অবৈধ রাস্তা ও টোল আদায়ের সাম্রাজ্য।