বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামা, আকাশছোঁয়া জ্বালানির দাম আর টালমাটাল অর্থনীতি। এই ত্র্যহস্পর্শ থেকে দেশকে বাঁচাতে এক নজিরবিহীন দাওয়াই দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দেশবাসীর কাছে তাঁর সনির্বন্ধ আবেদন— অন্তত এক বছরের জন্য সোনা কেনা থেকে বিরত থাকুন। সেই সঙ্গে জ্বালানি সাশ্রয়ে আবারও সেই করোনা পর্বের মতো ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ (WFH) এবং অনলাইন মিটিংয়ের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সোনার মায়া ত্যাগের আর্জি সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি দেশবাসীর কাছে আবেদন করছি, অন্তত এক বছরের জন্য বিয়ের অনুষ্ঠানে সোনা কেনা বন্ধ রাখুন।” ভারতে সোনা শুধু গয়না নয়, বরং আভিজাত্য ও আজীবনের সঞ্চয়। বিশেষ করে বাঙালি বিয়েতে সোনা ছাড়া অনুষ্ঠান ভাবাই যায় না। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য দেশজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে।
কেন এমন কঠিন সিদ্ধান্ত? অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তার নেপথ্যে রয়েছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার রক্ষা করার তাগিদ।
আমদানি খরচ: ভারত তার প্রয়োজনের প্রায় সবটুকু সোনাই বিদেশ থেকে আমদানি করে। অন্যদিকে ৮৫ শতাংশ অপরিশোধিত তেলও আসে বিদেশ থেকে।
ডলারের টানটান পরিস্থিতি: ইরান-আমেরিকা-ইজরায়েল সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলার থেকে লাফিয়ে ১২৬ ডলারে পৌঁছেছে। তেলের দাম মেটাতে গিয়ে রাজকোষের ডলারের ভাণ্ডারে টান পড়ছে।
টাকার দামের পতন: বিপুল ডলার দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় বিদেশি মুদ্রার বাজারে ভারতীয় টাকা ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। সোনা কেনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এই চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব বলে মনে করছে কেন্দ্র।
জ্বালানি বাঁচাতে ফিরছে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’? প্রধানমন্ত্রী শুধু সোনা নয়, জ্বালানি নিয়ে প্রতিটি নাগরিককে সতর্ক করেছেন। তিনি জানান, বিশ্ববাজারে পেট্রোল-ডিজেলের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে জ্বালানি বাঁচানো এখন জাতীয় কর্তব্য। আর সেই কারণেই অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমাতে ফের ভিডিও কনফারেন্সিং এবং বাড়ি থেকে কাজের (WFH) সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
পুরনো স্মৃতি ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি মেটাতে এর আগেও কেন্দ্র সরকার সোনার ওপর আমদানি শুল্ক বাড়ানো বা গোল্ড বন্ডে উৎসাহ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু সরাসরি বিয়ের মরসুমে সোনা না কেনার এই আবেদন গয়না শিল্প এবং সাধারণ মানুষের মনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে কাটাছেঁড়া।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা ভারতের হাতে নেই, কিন্তু সোনার চাহিদাই এখন অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষার একমাত্র চাবিকাঠি। এখন দেখার, প্রধানমন্ত্রীর এই আবেদনে সাড়া দিয়ে দেশবাসী সত্যিই সোনার মোহ ত্যাগ করে কি না।





