নব্বইয়ের দশকের গুয়াহাটির কটন কলেজ। আইন পড়ুয়া ২২ বছরের এক তরুণকে তার বান্ধবী জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোমার সম্পর্কে মাকে কী বলবো?” উত্তর এসেছিল আত্মবিশ্বাসে ভরপুর— “তোমার মাকে বলো, আমি একদিন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হবো।” উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানুষকে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের দাম হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে চোকাতে হয়েছিল অনেক অপমানের বিনিময়ে। আজ সেই তরুণই আধুনিক ভারতের রাজনীতির ‘উত্তর-পূর্বের চাণক্য’।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বলছে, হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে এনডিএ জোট ১২৬টি আসনের মধ্যে ১০১টি জিতে এক অনন্য রেকর্ড গড়েছে। বিজেপি একাই জিতেছে ৮২টি আসন। এই জয় কেবল পরিসংখ্যানের খেলা নয়, বরং এটি সেই রাজনৈতিক অপমানের এক চূড়ান্ত বদলা, যা এক সময় হিমন্তকে সহ্য করতে হয়েছিল। কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের ‘দুর্ভেদ্য’ দুর্গ আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে হিমন্তের রণকৌশলে।
অপমান থেকে উত্তরণ: ‘পিদ্দি’ বনাম জেদ
রাজনীতিতে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার দলবদল নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু আসল নাটক শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। দিল্লির এক বৈঠকে রাহুল গান্ধী যখন অসমের গুরুতর সমস্যাগুলি শোনার বদলে নিজের পোষা কুকুর ‘পিদ্দি’কে বিস্কুট খাওয়াতে ব্যস্ত ছিলেন, তখনই জন্ম নিয়েছিল এক ভয়ংকর জেদ। হিমন্ত বুঝেছিলেন, যেখানে তাসের ঘরের রাজাদের থেকে পোষা প্রাণীর কদর বেশি, সেখানে অসমীয়াদের লড়াই টিকবে না। তিনি দল ছাড়লেন এবং প্রতিজ্ঞা করলেন উত্তর-পূর্ব থেকে কংগ্রেসের নাম মুছে ফেলার। ২০২৬-এর ফলাফল আজ সেই তেরস্কারের অন্তিম বিচার।
কটন কলেজের আঁতুড়ঘর থেকে বিধানসভা
গুয়াহাটির কটন কলেজ বরাবরই অসমের রাজনীতির চালিকাশক্তি। হিমন্ত ছিলেন ছাত্র সংসদের দাপুটে সাধারণ সম্পাদক। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ভোটে হারলেও পিভি নরসিমা রাওয়ের পরামর্শে নিজের মাটি কামড়ে পড়েছিলেন। ২০০১ সালে নিজের রাজনৈতিক গুরু ভৃগু ফুকনকে হারিয়ে শুরু হয় তাঁর জয়ের জয়যাত্রা। ১৫ বছর কংগ্রেস সরকারের নম্বর টু হয়ে থাকলেও, যখন এক নম্বর হওয়ার সময় এল, তখন তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো। আজ বিজেপি তথা এনডিএ-র হয়ে সেই হিমন্তই প্রতিবেশী ৬-৭টি রাজ্যের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন।
সাংস্কৃতিক রক্ষক ও লাচিত বরফুকনের উত্তরাধিকার
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা নিজেকে স্রেফ এক রাজনীতিবিদে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মুঘলদের পরাজিত করা মহাবীর লাচিত বরফুকনের উত্তরাধিকারকে তিনি একবিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়েছেন। অনুপ্রবেশ এবং ডেমোগ্রাফিক বদল নিয়ে তাঁর আপসহীন অবস্থান অসমীয়া অস্মিতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬-এর জয় প্রমাণ করল, অসমের মানুষ এমন এক নেতাকে বেছে নিয়েছে যিনি রাখঢাক না করে নিজের সংস্কৃতির কথা বলতে পারেন।





