নিজের কানে নিজের কথা শুনুন, বিজ্ঞান বলছে এতেই লুকিয়ে সাফল্যের চাবিকাঠি!

সচেতন বা অবচেতন মনে, সারাদিন আমরা নিজেদের সঙ্গে কত না কথা বলি! “আমার দেরি হচ্ছে”, “এ কাজ আমার দ্বারা হবে না”, “আমি এই পোশাকটা পছন্দ করি”, “কাজটা সময় মতো শেষ করতে পারলাম না”, “এটা তো খুবই সহজ”, “বিয়ে তো আর হল না”, “মনের মতো কাউকে পেলাম না”, “মনে হয় আমার ক্যানসার হয়েছে”, অথবা “আর কখনো স্ত্রীর গায়ে হাত তুলব না” – এই ধরনের অজস্র ভাবনা মনের মধ্যে ভিড় করে আসে। কিন্তু এই কথাগুলো কি কখনো উচ্চস্বরে নিজেকে বলেছেন? যদি আপনার উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে আপনি বিজ্ঞানের দেখানো পথেই হাঁটছেন!

ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার, সাইকোথেরাপিস্ট এবং “ফাইন্ডিং ইওর রুবি স্লিপার্স: ট্রান্সফরমেটিভ লাইফ লেসন’স ফ্রম দ্য থেরাপিস্ট’’স কাউচ”-এর লেখক লিসা ফেরেন্টজ বলছেন, “গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চস্বরে কিছু ভাবনা প্রকাশ করা বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে জয় করতে বা তুলনামূলক ভালো ফল পেতে সাহায্য করে এবং এই অভ্যাস আমাদের সকলেরই করা উচিত।”

ফেরেন্টজ প্রায়শই তার রোগীদের মধ্যে ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি করতে অথবা তাদের প্রতিদিনের কাজকে আরও ফলপ্রসূ করতে উচ্চস্বরে নিজেদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, “নিজের ভাবনা উচ্চস্বরে নিজেকে শোনানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই অভ্যাস কোনো কাজের প্রতি আমাদের ভাবনা, মানসিক অবস্থা ও আচরণের ধরন সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য দেয় যা আমরা সাধারণত এড়িয়ে যাই।” যদি আমরা নিজেদের কানকে বেশি করে ইতিবাচক বা প্রেরণামূলক কথা শোনাই, তাহলে আমাদের উদ্যম এবং সাফল্যের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

মানসিক শক্তি বাড়ানোর একটি চমৎকার উপায় হল সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা, নিজের শক্তিশালী দিক এবং ইতিবাচক প্রতিজ্ঞা বা দৃষ্টিভঙ্গি লিখে রাখা এবং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তা উচ্চস্বরে নিজেকে শোনানো। প্রথম প্রথম কিছুটা অস্বস্তি লাগতে পারে, কিন্তু হাল ছেড়ে দেবেন না। ফেরেন্টজ বলেন, “অন্যান্য যেকোনো অভ্যাসের মতো, নিজে নিজে উচ্চস্বরে কথা বলার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে গেলে আপনি বুঝতে পারবেন এটি কত সহজ।” প্রকৃতপক্ষে, ইউনিভার্সিটি অব লেথব্রিজের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ছাত্রকে নিজেদের সঙ্গে ইতিবাচক কথা বলা এবং নেতিবাচক কথা এড়িয়ে যাওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, তারা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ ও প্রতিক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিল।

ফেরেন্টজ সম্ভাব্য ভীতিকর বা কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য উচ্চস্বরে নিজের কানকে উদ্দীপনামূলক কথা শোনাতে উৎসাহিত করছেন। তিনি বলেন, “যখন আমরা নিজেদেরকে ইতিবাচক কথা শোনাই, তখন আমাদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পায় – এর ফলে আমরা সামনে আসা যেকোনো চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার সাহস পাই।” একটি গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব ক্রীড়াবিদ প্রতিযোগিতার পূর্বে প্রায়শই নিজেদের সঙ্গে প্রেরণামূলক কথা বলতেন, তাদের সাফল্যের হার অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি ছিল।

এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে নিজেকে ইতিবাচক কথা শোনালে মানসিক শক্তি এবং কঠিন কাজে সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়ে। তবে এর বিপরীতটাও সত্যি। নিজেকে হতাশার কথা শোনালে আপনার মধ্যে উদ্যমহীনতা সৃষ্টি হতে পারে, যার ফলে কঠিন কাজ তো দূরের কথা, সহজ কাজেও অনীহা জন্মাবে। ইতিবাচক ভাবনা যেমন কাজে লেগে থাকার প্রেরণা দিয়ে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়, তেমনই নেতিবাচক ভাবনা অবশিষ্ট মানসিক শক্তিও কেড়ে নিয়ে ব্যর্থতাকে আরও দ্রুত করে তোলে। তাই সব ধরনের ভাবনা উচ্চস্বরে প্রকাশের প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র ইতিবাচক বা প্রেরণামূলক কথাই নিজেকে শোনান – আত্মবিশ্বাস বা মানসিক শক্তির বিনাশকারী ভাবনা থেকে দূরে থাকুন।