বর্তমান যুগে ক্যারিয়ারের ইঁদুরদৌড়ে সামিল হতে আইটি, কল সেন্টার কিংবা স্বাস্থ্যসেবার মতো পেশায় নাইট শিফট বা রাত জেগে কাজ করা এখন অনেকেরই বাধ্যবাধকতা। অনেকেই ভাবেন, রাতে জেগে কাজ করে দিনে ঘুমিয়ে নিলেই বুঝি শরীরের ঘাটতি মিটে গেল। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে এক ভয়ংকর সত্য। আপনি বাইরে থেকে যতটা সুস্থ বা ফিট মনে করছেন নিজেকে, নাইট শিফটের প্রভাবে আপনার শরীরের ভেতরে হয়তো তার চেয়েও দ্রুত গতিতে ডানা মেলছে মারণ রোগ। ২০২৬-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা রাতজাগা কর্মীদের স্বাস্থ্যের ওপর যে ‘বোমা’ ফাটিয়েছে, তা জেনে আঁতকে উঠছেন বিশেষজ্ঞরা।
তরুণ প্রজন্মের শরীরে বার্ধক্যের হানা! একটি নামী আইটি প্রতিষ্ঠানের নাইট শিফট ও ডে শিফটের কর্মীদের ওপর চালানো সাম্প্রতিক এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, নাইট শিফটে কাজ করা প্রায় ৭৭ শতাংশ কর্মী ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’ বা ইনসুলিন প্রতিরোধ সমস্যায় ভুগছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই কর্মীদের গড় বয়স মাত্র ২৮ বছর এবং তাঁদের কারোরই ওজন অতিরিক্ত নয়। অর্থাৎ, বাইরে থেকে তাঁদের একদম স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে তাঁরা ডায়াবেটিসের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন।
কেন নষ্ট হচ্ছে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ? চিকিৎসকদের মতে, প্রতিটি মানুষের শরীরে একটি প্রাকৃতিক ‘জৈবিক ঘড়ি’ বা সার্কাডিয়ান রিদম থাকে। সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শরীরের হরমোন নিঃসরণ ও বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয়। যখনই কেউ এই নিয়মের উল্টো পথে হাঁটেন, তখনই শরীরের মেলাটোনিন হরমোন কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে কোষের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া থমকে যায়।
শরীরের ভেতরে যা ঘটছে:
হরমোনের বিপর্যয়: পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন এবং নারীদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেনের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
কোলেস্টেরলের হেরফের: রক্তে ক্ষতিকর চর্বি (LDL) বাড়ছে এবং উপকারী কোলেস্টেরল (HDL) আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।
ভিটামিন ডি-এর আকাল: দিনের আলো না পাওয়ায় নাইট শিফট কর্মীরা হাড়ের ক্ষয় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
থাইরয়েডের সমস্যা: হরমোনের তারতম্যের কারণে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা নষ্ট হচ্ছে, যা ওজন বৃদ্ধি ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বাঁচবেন কীভাবে? বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: চিকিৎসকদের মতে, নাইট শিফটে কাজ করা যাঁদের পেশাগত বাধ্যবাধকতা, তাঁদের বাড়তি সচেতন হতে হবে। ১. দিনে যখনই ঘুমাবেন, ঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার ও শান্ত রাখুন। ২. রাতে ভারী বা তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে হালকা ও পুষ্টিকর খাবার খান। ৩. নিয়মিত রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল ও হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা করান। ৪. দিনের বেলা অন্তত কিছুক্ষণ রোদে থাকার চেষ্টা করুন যাতে ভিটামিন ডি-এর অভাব না হয়।
মনে রাখবেন, বাহ্যিক চাকচিক্য বা স্বাভাবিক ওজন সুস্থতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। শরীরের ভেতরের এই নীরব ক্ষয় রোধ করতে আজই সতর্ক হোন।





