দেরিতে ঘুম আর অকালমৃত্যু? অনিদ্রা কিভাবে ডেকে আনছে হার্ট অ্যাটাক, ডায়াবেটিস ও আরও ৭ মারণ রোগ, জেনে নিন!

আপনার ঘুমানোর অভ্যাস কি গভীর রাত পর্যন্ত গড়ায়? তাহলে সাবধান! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের এই ব্যক্তিগত অভ্যাসই হয়তো অজান্তেই ডেকে আনছে একাধিক মারণ রোগ। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাত ১১টার পর ঘুমাতে গেলে শুধু হার্টের রোগ বা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিই দ্বিগুণ হয় না, বরং আরও বেশ কিছু গুরুতর শারীরিক সমস্যা বাড়িয়ে তোলে। দিনের পর দিন ঘুমের চক্র নষ্ট করলে আপনার শরীর কিভাবে ভিতর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা জেনে নেওয়া যাক।

ঘুমের অভাব ও তার মারাত্মক পরিণতি:

১. রক্তচাপ বৃদ্ধি: একাধিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, দেরি করে ঘুমানোর অভ্যাস শরীর ও মস্তিষ্কের ওপর মারাত্মক চাপ ফেলে, যার ফলে রক্তচাপ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এর প্রভাব শুধু উচ্চ রক্তচাপেই সীমাবদ্ধ থাকে না, কিডনির মারাত্মক ক্ষতি, স্ট্রোক এবং দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার মতো গুরুতর সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

২. স্ট্রেস বৃদ্ধি, আয়ু হ্রাস: ব্যস্ততার কারণে অনেকেই রাতে দেরিতে ঘুমাতে বাধ্য হন এবং সকালে দ্রুত উঠে যান। এতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় দেহের ভেতরে ‘স্ট্রেস হরমোন’ (কর্টিসল) ক্ষরণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। এই হরমোনের আধিক্য মানসিক অবসাদের ঝুঁকি বাড়ায় এবং এর সঙ্গে আরও হাজারখানেক রোগের আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়, যা আয়ু কমিয়ে দিতে পারে।

৩. সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হ্রাস: মস্তিষ্ক যদি পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পায়, তবে তার কার্যক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসে। মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু অংশের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার কারণে দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ব্যাহত হয়, যা দৈনন্দিন কাজকর্মে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৪. দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা: রাত জেগে কাজ করলে কর্টিসল হরমোনের মতো স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। যদিও এটি আপনাকে রাত জেগে কাজ করার সামর্থ্য দিতে পারে, কিন্তু এর বিনিময়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। এর ফলে নানাবিধ রোগ অনায়াসে শরীরে বাসা বাঁধতে পারে।

৫. দৃষ্টি আকর্ষণকারী ওজন বৃদ্ধি: দিনের পর দিন রাতে জেগে থাকলে খাবার সঠিকভাবে হজম হতে পারে না। ফলে একদিকে যেমন গ্যাস-অম্বলের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়, তেমনই ওজনও বাড়তে শুরু করে চোখে পড়ার মতো। আর অতিরিক্ত ওজন ধীরে ধীরে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরলের মতো মারণ রোগ ডেকে আনে।

৬. আঘাতের প্রবণতা বৃদ্ধি: পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার কারণে মনোযোগ যেমন হ্রাস পায়, তেমনই শরীরের সচলতাও কমতে শুরু করে। এর ফলে কর্মক্ষেত্রে বা অন্য কোথাও চোট-আঘাত লাগার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

৭. পিতা-মাতা হওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা: শরীরের নিজস্ব জৈবিক ছন্দ (biological clock) বিগড়ে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সন্তান ধারণের ক্ষমতায়। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, যেসব নারীরা নিয়মিত নাইট শিফট করেন, তাদের মিসক্যারেজ (গর্ভপাত) এবং প্রিটার্ম ডেলিভারি (অপরিপক্ক শিশুর জন্ম) হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। একই সাথে কম ওজনের বাচ্চা জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। তাই মা হওয়ার পরিকল্পনা থাকলে রাত জেগে কাজ করা থেকে বিরত থাকুন।

৮. মস্তিষ্কের ক্ষমতা হ্রাস: রাতের সময়টি মস্তিষ্কের আরাম ও পুনর্গঠনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই সময় কাজ করলে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের ক্ষমতা কমতে শুরু করে। এর ফলে ডিপ্রেশন, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, স্লো কগনিটিভ ফাংশন, স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়াসহ আরও অনেক গুরুতর মানসিক ও স্নায়বিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

সুতরাং, ঘুমের সঙ্গে আপস করা মানে নিজের স্বাস্থ্যের সঙ্গেই আপস করা। একটি সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন চাইলে আপনার ঘুমের সময়সূচী নিয়ে আজই সচেতন হন।