শুধু রেজিস্ট্রেশনই যথেষ্ট নয়! বিয়ের বৈধতা নিয়ে বড় রায় গুজরাত হাইকোর্টের

নিছক সরকারি রেজিস্ট্রেশন বা কাগজে-কলমে সই করলেই একটি বিয়ে আইনত বৈধ বলে গণ্য হয় না। হিন্দু রীতি-নীতি এবং শাস্ত্রীয় আচার-অনুষ্ঠান মেনে সাতপাক না ঘুরলে সেই বিবাহকে ‘সংস্কার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় এমনই পর্যবেক্ষণ দিল গুজরাত হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, হিন্দু বিবাহ কোনো সাধারণ সামাজিক চুক্তি বা আনন্দ-ফুর্তির বিষয় নয়, এটি একটি পবিত্র বন্ধন।
ঘটনার সূত্রপাত ব্রিটেন-বাসী কৌশল সোনারের একটি আবেদনকে কেন্দ্র করে। কৌশলের অভিযোগ ছিল, আমেদাবাদের এক মহিলা নিজেকে তাঁর স্ত্রী বলে দাবি করছেন এবং একটি বিয়ের শংসাপত্র বা ম্যারেজ সার্টিফিকেট দেখিয়ে সমাজ ও প্রশাসনের কাছে ভুল তথ্য পেশ করছেন। কৌশল জানান, ওই মহিলার সঙ্গে তাঁর কোনোদিন দেখা হয়নি, একসঙ্গে বসবাস করার তো প্রশ্নই ওঠে না। এমনকি শংসাপত্রে তাঁর স্বাক্ষরও জাল করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। প্রাথমিক পর্যায়ে পারিবারিক আদালত কৌশলের আবেদন খারিজ করে দিলেও, তিনি গুজরাত হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
মামলার শুনানিতে গুজরাত হাইকোর্টের বিচারপতি ইলেশ ভোরা এবং বিচারপতি আরটি ভাচানির ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, অগ্নিসাক্ষী করে সাতপাক ঘোরার মতো আচার-অনুষ্ঠান হিন্দু বিবাহের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই আচার বর-কনের আত্মাকে শুদ্ধ করে এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটায়। আদালতের পর্যবেক্ষণ, শুধু নাচ-গান, খাওয়া-দাওয়া বা টাকার লেনদেনের নাম বিয়ে নয়। হিন্দু বিবাহ আইনের ৭ নম্বর ধারার উল্লেখ করে আদালত স্পষ্ট করেছে যে, বিবাহ সম্পন্ন হতে গেলে শাস্ত্রীয় রীতি-নীতি মানা বাধ্যতামূলক।
আদালত আরও লক্ষ্য করেছে যে, বিবাদী পক্ষ বা ওই মহিলা নিজেই ফ্যামিলি কোর্টে স্বীকার করেছেন যে, তাঁদের মধ্যে কোনো আচার-অনুষ্ঠান হয়নি এবং তাঁরা কোনোদিন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাসও করেননি। আদালতের মতে, যে বিয়ের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বা আবশ্যিক আচারটুকুও পালিত হয়নি, তাকে কোনোভাবেই বৈধ বিবাহ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। হিন্দু ধর্মে স্ত্রীকে স্বামীর ‘অর্ধাঙ্গিনী’ বলা হয় এবং বিয়ের মাধ্যমেই একটি নতুন পরিবারের ভিত্তি স্থাপিত হয়। এই পবিত্রতা রক্ষায় আদালত পারিবারিক আদালতের পূর্বের রায় খারিজ করে কৌশল সোনারের বিয়েকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করেছে।
আইনজীবীদের মতে, এই রায় বিবাহ সংক্রান্ত জালিয়াতির ক্ষেত্রে একটি বড় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিচ্ছেদ বা সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদে ভুয়ো নথির আশ্রয় নিয়ে বিয়ের দাবি করা হয়। হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট করে দিল যে, কেবল রেজিস্ট্রেশনই বিয়ের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, যদি না তার পেছনে উপযুক্ত শাস্ত্রীয় ও সামাজিক প্রথা পালিত হয়। বিয়ের এই আধ্যাত্মিক ও আইনি মর্যাদা রক্ষার নির্দেশ দিয়ে আদালত সমাজে এক কড়া বার্তা পৌঁছে দিল।