কোন বয়সের পর টিভি দেখা কমানো উচিত, জেনেনিন কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

একসময় বাবা-মা বা পরিবারের বড়রা ছোটবেলায় সাবধান করতেন যে, সারাক্ষণ খুব কাছে বসে বেশি টিভি দেখলে চোখ নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সতর্কতার তালিকায় এবার যোগ হয়েছে আরও এক নতুন ও মারাত্মক উদ্বেগ। সাম্প্রতিক বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে একটানা টেলিভিশনের সামনে বসে থাকার অভ্যাস শুধু চোখের বারোটা বাজায় না, বরং মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যেও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে মধ্যবয়সে অতিরিক্ত সময় ধরে টিভি দেখার সঙ্গে স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়া এবং মস্তিষ্কের গঠন পরিবর্তনের গভীর যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
অবশ্য বিশেষজ্ঞরা এটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই গবেষণাগুলি মূলত একটি সম্ভাব্য সম্পর্ক (Association) নির্দেশ করেছে। অর্থাৎ, সরাসরি শুধু টিভি দেখাই যে মস্তিষ্ক সঙ্কুচিত হওয়ার একমাত্র কারণ, এমনটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে এক জায়গায় নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার অন্যান্য অভ্যাসও এর পেছনে সমানভাবে ভূমিকা রাখতে পারে।
মধ্যবয়সে বাড়ছে মারাত্মক ঝুঁকি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সী বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও অভ্যাস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষকদের নজরে এসেছে যে, যারা প্রতিদিন পাঁচ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে নিয়মিত টিভি দেখেন এবং দীর্ঘ দিন ধরে এই বদভ্যাস বজায় রাখেন, তাদের মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট অংশে বয়সজনিত পরিবর্তন বা ক্ষয় তুলনামূলকভাবে অনেক দ্রুত দেখা দিতে পারে।
স্মৃতিশক্তির ওপর সরাসরি কুপ্রভাব
আমাদের মস্তিষ্কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো হিপ্পোক্যাম্পাস (Hippocampus), যা মানবদেহের নতুন স্মৃতি তৈরি এবং তা সঠিকভাবে সংরক্ষণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ক্রিয়ভাবে টিভি দেখার অভ্যাস এই হিপ্পোক্যাম্পাসের আয়তনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। হিপ্পোক্যাম্পাসে কোনো পরিবর্তন বা ক্ষতি দেখা দিলে নতুন তথ্য মনে রাখা, কোনো নতুন বিষয় শেখা এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। উল্লেখ্য, অ্যালঝেইমার (Alzheimer’s) রোগের প্রাথমিক পর্যায়েও মস্তিষ্কের এই অংশেই প্রথম পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও পঙ্গু হয়ে যেতে পারে
মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব (Frontal Lobes) আমাদের পরিকল্পনা করা, কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া, মনোযোগ ধরে রাখা এবং যেকোনো সমস্যা দ্রুত সমাধান করার মতো উচ্চতর মানসিক কাজগুলি নিয়ন্ত্রণ করে। দীর্ঘ সময় ধরে একটানা স্ক্রিনের সামনে অলসভাবে বসে থাকলে এই অংশের কার্যকারিতাও দারুণভাবে ব্যাহত হতে পারে বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে মনোযোগ কমে যাওয়া, কাজের প্রতি আগ্রহ চিরতরে হারিয়ে যাওয়া কিংবা অতি সাধারণ সিদ্ধান্ত নিতেও মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রেও চরম সতর্কতা জরুরি
বড়দের পাশাপাশি শৈশব ও কৈশোরেও অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এই বয়সেই শিশুদের মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হয়। এই সময়ে দীর্ঘক্ষণ টিভি বা মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখলে পড়াশোনায় মনোযোগে ঘাটতি, কল্পনাশক্তির স্বাভাবিক বিকাশে বাধা এবং পর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকাণ্ড বা খেলাধুলার অভাব দেখা দিতে পারে। তাই ছোট থেকেই শিশুদের স্ক্রিন টাইম কঠোরভাবে সীমিত রাখা এবং তাদের মাঠে খেলাধুলা করা, বই পড়া ও সৃজনশীল বিভিন্ন কাজে উৎসাহিত করা অত্যন্ত জরুরি।
যেভাবে এই ঝুঁকি কমাবেন?
এর অর্থ এই নয় যে আপনাকে আজ থেকেই চিরতরে টিভি দেখা বন্ধ করে দিতে হবে। তবে বিনোদনের সময়সীমা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি:
একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোফায় বসে না থেকে প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর উঠে একটু হাঁটাহাঁটি করুন।
নিয়মিত হালকা ব্যায়াম বা যোগব্যায়াম করুন।
অবসর সময়ে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন, নতুন কোনো দক্ষতা অর্জন করুন এবং গ্যাজেট থেকে দূরে থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটান। এই সমস্ত ছোট অভ্যাসগুলি মস্তিষ্ককে সর্বদা সচল ও চনমনে রাখতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুস্থ ও সবল মস্তিষ্কের অধিকারী হতে হলে শুধু স্ক্রিন টাইম কমানোই একমাত্র সমাধান নয়। এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত ও গভীর ঘুম, সুষম ও পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং মানসিকভাবে সক্রিয় জীবনযাপন—এই চারটি মৌলিক বিষয় একসঙ্গে মেনে চললে তবেই দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য অটুট রাখা সম্ভব।