অফিসে দারুণ সাফল্য পেয়েও কেন অজানা ভয়? জানুন এর মনস্তাত্ত্বিক কারণ

অফিসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বড় প্রজেক্ট আপনি অত্যন্ত সফলভাবে শেষ করলেন। বসের কাছ থেকে পেলেন উচ্চকিত প্রশংসা, সহকর্মীরাও আপনার কাজের ভূয়সী প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অথচ এত সাফল্যের পরেও বাড়ি ফিরেও আপনার মনে অদ্ভুত এক অস্বস্তি কাজ করছে—”পরের বার যদি আর এমনটা করতে না পারি?”, “সবাই যদি হতাশ হয়?” এই ধরনের নেতিবাচক চিন্তা বারবার আপনার মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করে।
অনেকেই এই অবস্থাকে শুধুমাত্র ‘পারফেকশনিস্ট’ স্বভাব কিংবা সাধারণ ‘ব্যর্থতার ভয়’ বলে ভুল করেন। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এর মূল কারণটি সম্পূর্ণ আলাদা—যাকে বলা হয় ‘ফেয়ার অফ ডিসপয়েন্টিং আদার্স’ (Fear of Disappointing Others) বা অন্যকে হতাশ করার ভয়।
১. ব্যর্থতার ভয় বনাম অন্যকে হতাশ করার ভয়
প্রথম দেখায় দুটি বিষয়কে একই রকম মনে হতে পারে, কিন্তু এদের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম অথচ গভীর তফাত রয়েছে:
ব্যর্থতার ভয়: এটি মূলত নিজের ব্যক্তিগত লক্ষ্য পূরণ করতে না পারার আশঙ্কা থেকে তৈরি হয়। এখানে ব্যক্তি নিজের সাফল্য বা ব্যর্থতাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।
অন্যকে হতাশ করার ভয়: এটি তৈরি হয় চারপাশের সম্পর্ক, প্রত্যাশা এবং অন্যের অটুট বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। এখানে নিজের ক্ষতি হওয়ার চেয়েও এই ভেবে বেশি কষ্ট হয় যে—পরিবার, সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হয়তো আর আগের মতো অন্ধের মতো বিশ্বাস করবেন না। অনেক সময় এই অতিরিক্ত ভয়ের কারণেই মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় এবং বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও অপরাধবোধে (Guilt) ভুগে।
২. প্রশংসা পাওয়ার পরও কেন উদ্বেগ বাড়ে?
সাধারণভাবে মানুষের ধারণা যে, কাজের প্রশংসা পেলে আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর ঠিক উল্টোটা ঘটে। একবার দুর্দান্ত কাজ করার পর তাঁরা অবচেতনভাবেই মনে করতে শুরু করেন যে, এবার বুঝি সবাই তাঁদের কাছ থেকে ঠিক একই রকম বা তার চেয়েও ভালো মানের কাজই আশা করবে। ফলে প্রতিটি নতুন দায়িত্ব তাঁদের কাছে পুরস্কারের বদলে এক একটা বিশাল চাপের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাঁরা নিজের শারীরিক ও মানসিক প্রয়োজনকে পুরোপুরি উপেক্ষা করতে শুরু করেন। অসুস্থ অবস্থাতেও ছুটি নিতে চান না এবং অতিরিক্ত কাজের চাপে কাউকেও কোনো কাজের জন্য ‘না’ বলতে পারেন না।
৩. ইমপোস্টার সিন্ড্রোমের ছায়া
এই ধরনের মানসিক অবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে ‘ইমপোস্টার সিন্ড্রোম’ (Imposter Syndrome)। এটি এমন একটি মানসিক প্রবণতা, যেখানে ব্যক্তি নিজের অর্জিত সাফল্যকে নিজের মেধা ও দক্ষতার ফল হিসেবে মেনে নিতে পারেন না। বরং তাঁরা মনে করেন এটি স্রেফ ভাগ্য, কাকতালীয় ঘটনা বা অন্যের ভুল মূল্যায়নের কারণেই হয়েছে। তাঁদের মনে সবসময় একটি অবচেতন ভয় কাজ করে—”এই বুঝি সবাই বুঝে ফেলল যে আমি আসলে ততটা যোগ্যই নই!” ফলে প্রতিটি নতুন কাজ বা প্রজেক্ট তাঁদের কাছে নিজেকে প্রমাণ করার কঠিন পরীক্ষার মতো মনে হতে পারে।
৪. এর শেকড় কোথায় প্রোথিত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের মানসিক জটিলতার শিকড় অনেক ক্ষেত্রেই লুকিয়ে থাকে মানুষের শৈশবের অভিজ্ঞতা ও লালনপাপনের মধ্যে:
যেসব শিশু ছোটবেলায় কেবল ভালো ফলাফল, নিখুঁত আচরণ বা অসম্ভব ভালো কাজের জন্যই প্রশংসা বা ভালোবাসা পেত, তারা ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তাদের নিজস্ব কোনো মূল্য নেই—তাদের সমস্ত মূল্যায়ন কেবল সাফল্যের ওপরই নির্ভরশীল।
আবার যেসব পরিবারে কঠোর নিয়ম, শৃঙ্খলা বা অন্যের উচ্চ প্রত্যাশা পূরণের ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হয়, সেখানকার শিশুরা বড় হয়ে নিজের আত্মসম্মান বা আত্মমর্যাদাকে অন্যের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলে। যার ফলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও তারা সবসময় অন্যকে খুশি করার লাগাতার দৌড়ে নিজের মানসিক শান্তি হারিয়ে ফেলে।
এই মানসিক চাপ ও ভয় থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নিজের সাফল্যকে আন্তরিকভাবে স্বীকার করতে শেখা এবং নিজের ‘ভুল করার অধিকার’কে সহজভাবে মেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
মনে রাখবেন, পৃথিবীর কোনো কাজেই শতভাগ নিখুঁত বা পারফেক্ট হওয়া সম্ভব নয়।
মাঝে মাঝে নিজের মতো করে বিশ্রাম নেওয়া, প্রয়োজনের সময় অন্যের সাহায্য চাওয়া এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেওয়াও একটি সুস্থ ও সুন্দর কর্মজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সবার শেষে এটি মনে রাখা দরকার যে, মানুষের প্রকৃত ভালোবাসা বা সম্মান শুধু আপনার কর্মদক্ষতার ওপর নির্ভর করে না; একটি সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস, আন্তরিকতা এবং মানবিকতা।
যদি এই অন্যকে হতাশ করার ভয় আপনার ঘুম, কাজ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার ওপর দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে থাকে, তবে একজন পেশাদার মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। সঠিক সময়ে এই অনুভূতিকে চিহ্নিত করতে পারলে অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ ঝেড়ে ফেলে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করা সম্ভব।