টানা অল্প জ্বর? অবহেলা করবেন না, হতে পারে গুরুতর রোগের ইঙ্গিত

টানা অল্প জ্বর? অবহেলা করবেন না, হতে পারে গুরুতর রোগের ইঙ্গিত
দিনহাটা, পশ্চিমবঙ্গ: শরীরের তাপমাত্রা সামান্য বেশি থাকা অনেক সময়ই সাধারণ ব্যাপার মনে হলেও, এটি কিছু গুরুতর রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যক্ষ্মা, লিম্ফোমা, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া, এইচআইভি সংক্রমণ, শরীরের বিভিন্ন ফোঁড়া (যেমন ফুসফুসে বা লিভারে), কানেকটিভ টিস্যু রোগ (যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, এসএলই), থাইরয়েড রোগ (হাইপারথাইরয়ডিজম) এবং এমনকি ফুসফুস, লিভার ও কিডনি ক্যান্সারের মতো রোগেও অল্প অল্প জ্বর থাকতে পারে।
যদি কারো দীর্ঘদিন ধরে একটানা অল্প জ্বর থাকে, তবে রোগ নির্ণয়ের জন্য রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস জানা অপরিহার্য। জ্বর কখন আসে, কীভাবে শুরু হয় ও শেষ হয়, দিনের কোন সময় জ্বর বেশি থাকে এবং জ্বরের সাথে অন্য কোনো উপসর্গ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিনের অল্প জ্বরের কিছু বিশেষ লক্ষণ উল্লেখ করেছেন, যা নির্দিষ্ট রোগের ইঙ্গিত দিতে পারে:
যক্ষ্মা (Tuberculosis): দীর্ঘদিনের অল্প অল্প জ্বর, যা সাধারণত বিকেলের দিকে বাড়ে, রাতে থাকে এবং সকালে কমে যায়। ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে যায় এবং এর সাথে দুই সপ্তাহের বেশি কাশি, কখনো কাশির সাথে রক্ত, ওজন হ্রাস, খাবারে অরুচি এবং যক্ষ্মা রোগীর সংস্পর্শে থাকার ইতিহাস থাকলে যক্ষ্মা সন্দেহ করা হয়।
লিম্ফোমা (Lymphoma): দীর্ঘদিনের জ্বরের পাশাপাশি রাতে শরীর ঘামানো, ক্ষুধামন্দা, শরীরে চুলকানি, জন্ডিসের ইতিহাস এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়ার ইতিহাস থাকলে লিম্ফোমা সন্দেহ করা হয়।
লিভারে ফোঁড়া (Liver Abscess): অল্প অল্প জ্বরের সাথে পেটের ডান দিকের উপরের অংশে ব্যথা এবং মাঝেমধ্যে পাতলা পায়খানার ইতিহাস থাকলে এবং পরীক্ষায় জন্ডিস ও লিভার বড় পাওয়া গেলে লিভারে ফোঁড়া সন্দেহ করা হয়।
ফুসফুসে ফোঁড়া (Lung Abscess): কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা, ঘাম দিয়ে জ্বর কমা এবং দুর্গন্ধযুক্ত হলুদ রঙের কাশি থাকলে ফুসফুসে ফোঁড়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
কালাজ্বর (Kala-azar): দীর্ঘদিনের জ্বরের সাথে খাবার রুচি স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও ওজন কমে যাওয়া, যেখানে বাস করেন সেখানকার পরিবেশ (যেমন মাটির ঘর, মেঝেতে থাকা, পাশে গরুর ঘর) এবং পরীক্ষায় রক্তশূন্যতা ও পেটের উপরিভাগে চাকা পাওয়া গেলে কালাজ্বর সন্দেহ করা হয়।
কানেকটিভ টিস্যু রোগ (Connective Tissue Diseases): দীর্ঘদিনের জ্বরের সাথে গিঁটে গিঁটে ব্যথা এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ব্যথা বৃদ্ধি পাওয়া, মুখে ঘা ও গায়ে লাল লাল দাগের ইতিহাস থাকলে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা এসএলই-এর মতো কানেকটিভ টিস্যু রোগ সন্দেহ করা হয়।
এমন জ্বর হলে শরীর দুর্বল লাগে এবং গা, হাত, পায়ে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। সাময়িক উপশমের জন্য অনেকেই প্যারাসিটামলের উপর ভরসা করেন। তবে দ্রুত সুস্থতার জন্য কিছু ঘরোয়া উপায়ও অবলম্বন করা যেতে পারে:
জ্বর কমানোর ঘরোয়া উপায়:
পর্যাপ্ত জল পান: জ্বর হলে শরীর ডিহাইড্রটেড হয়ে যেতে পারে। তাই প্রচুর পরিমাণে জল পান করা জরুরি। এর পাশাপাশি জুস বা স্যুপও খাওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে স্যালাইনও উপকারী।
বিশ্রাম: জ্বরের সময় শরীরের বিশ্রাম প্রয়োজন। কারণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকে, তাই শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম শরীরকে দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করে। শিশুদের ক্ষেত্রে বিশ্রামের উপর বিশেষ জোর দেওয়া উচিত।
জলপটি: জ্বর কমানোর একটি অন্যতম কার্যকর উপায় হলো মাথায় জলপটি দেওয়া। ঠান্ডা জলে কাপড় ভিজিয়ে কপালে ও মাথায় কিছুক্ষণ পর পর রাখুন।
তরল খাবার গ্রহণ: জ্বরের সময় শরীরে জলের অভাব দেখা দেয়, তাই প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার গ্রহণ করা উচিত। জল ছাড়াও ফলের রস ও হার্বাল চা পান করা যেতে পারে।
বরফের ব্যবহার: যদি ঠান্ডা লাগার কারণে জ্বর না হয়, তবে বরফের টুকরো মুখে রাখলে বা বরফ জল মিশ্রিত কাপড় কপালে রাখলে শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা কমানো যায়।
গার্গেল করা: ঠান্ডা লাগার কারণে গলা ব্যথা ও জ্বর হলে গরম জলে সামান্য লবণ ও আদা মিশিয়ে বারবার গার্গেল করলে আরাম পাওয়া যায়।
তবে মনে রাখবেন, ঘরোয়া উপায়গুলি সাময়িক উপশম দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘদিনের জ্বরের কারণ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অবহেলা করলে গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দিতে পারে।