সত্যজিতের শেষ ছবির আগেই হতো না শুট! উৎপল দত্তকে নিয়ে কোন বড় সত্যি ফাঁস করলেন কিংবদন্তি পরিচালক?

সালটা 1991। প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় প্রবাদপ্রতীম পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের শেষ ছবি ‘আগন্তুক’। ‘মনোমোহন মিত্র’র চরিত্রে পর্দায় ঝড় তোলেন মহান অভিনেতা উৎপল দত্ত। অনেকের মতে, এই সিনেমায় মনোমোহন মিত্রের মুখ দিয়ে সত্যজিৎ রায় যে সংলাপগুলো বলিয়েছিলেন, তা কেবল ছবির চিত্রনাট্য ছিল না, ছিল আধুনিক মানব সভ্যতার ভণ্ডামির বিরুদ্ধে এক চরম চাবুক। নৃতত্ত্ববিদ মনোমোহন মিত্রের দেশ-বিদেশ ঘোরার অভিজ্ঞতা এবং তাঁর জীবনদর্শন আধুনিক ভদ্রলোক সমাজকে এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। 35 বছর পরেও সেই প্রশ্ন আজও জীবন্ত। আসলে সত্যজিৎ রায়ের ছবিকে উৎপল দত্ত কুর্নিশ জানিয়েছেন বারবার। ‘পথের পাঁচালি’ বা ‘জন অরণ্য’ দেখে সত্যজিৎকে লিখেছিলেন আবেগঘন চিঠি। ‘স্যর’ বলে ডাকতেন সত্যজিৎকে। আর পরিচালকও মুগ্ধ ছিলেন উৎপলের প্রতিভায়। একবার এক সাক্ষাৎকারে পরিচালক বলেছিলেন, “উৎপল যদি রাজি না হত, তবে হয়তো আমি ‘আগন্তুক’ বানাতামই না।”

প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা, নির্দেশক ও নাট্যকার তথা আধুনিক ভারতীয় নাট্যমঞ্চে এক অগ্রগামী শক্তি ছিলেন উৎপল দত্ত। একই সঙ্গে, রূপোলি পর্দায় কখনও নেতিবাচক চরিত্রে আবার কখনও কৌতুক-অভিনয়ের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে আজও স্থায়ী জায়গা ধরে রেখেছেন তিনি। 1993 সালের 19 অগস্ট, 64 বছর বয়সে প্রয়াত হন এই অভিনেতা। আজ অভিনেতার প্রয়াণ দিবসে, ফিরে দেখা যাক সত্যজিৎ রায়ের শেষ ছবি ‘আগন্তুক’-এর নেপথ্যের কিছু কাহিনি ও বেশ কিছু সংলাপের দর্শনধারা। যা বলার ছিল, আমি সব বলে দিয়েছি… সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী বিজয়া রায়ের আত্মজীবনী ‘মানিক অ্যান্ড আই’ থেকে জানা যায়, আগন্তুক সিনেমার শেষ শটটি নেওয়ার পর সত্যজিৎ রায় ইউনিটকে প্যাক-আপের নির্দেশ দেন। এরপর স্ত্রী বিজয়ার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “ব্যাস, এইটুকুই। আমার কাজ শেষ। যা বলার ছিল, আমি সব বলে দিয়েছি।” এর কিছুদিন পরেই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং 1992 সালের 23 এপ্রিল প্রয়াত হন। সিনেমা সমালোচকদের মতে, ছবির মূল চরিত্র ‘মনোমোহন মিত্র’ আসলে ছিলেন স্বয়ং পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ছায়াস্বরূপ।

ঘরে আর বাইরে আগন্তুক! নানা সময়ের বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, 1990 সালের 22 নভেম্বর কলকাতা ময়দানে এই সিনেমার শুটিং শুরু হয়। প্রথম দিনের শটটি ছিল মনোমোহন মিত্র ও বাচ্চাদের। কাকতালীয়ভাবে, ঠিক সেই দিনই সত্যজিৎ রায়ের নাতি সৌরদীপ জন্মগ্রহণ করেন। এই খবর শুনে কৌতুকপ্রিয় উৎপল দত্ত রসিকতা করে বলেছিলেন, “এ যে ঘরে আর বাইরে আগন্তুক!” এই ছবির শান্তিনিকেতনে শুটিং সম্পর্কে শ্রীমতী বিজয়া রায় আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “শুটিংটা খুব এনজয় করেছি, কারণ উৎপলের মতো অভিনেতা আর মানিকের মতো পরিচালক—যাকে বলে ‘সোনায় সোহাগা’।” পরিচালক সন্দীপ রায়ের কথায়, “‘আগন্তুক’-এর চিত্রনাট্য বাবা উৎপলদাকে ভেবেই লিখেছিলেন। বাবা খালি প্রথমেই বলে দিয়েছিলেন, ‘দ্যাখো, ছবিতে তুমি আমার হয়ে কথা বলছ। শুধু এইটুকু জেনে রেখো। আর কিছুই নয়।'”

ছবির শেষের দিকে একটা সাঁওতাল গ্রামে নাচের দৃশ্য রয়েছে। অসুস্থতার কারণে সত্যজিৎ রায়ের পক্ষে তখন বেশি রোদে বা খোলা মাঠে থাকা বারণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি নিজে উপস্থিত থেকে নিখুঁতভাবে এই আদিবাসী সংস্কৃতির দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দী করেন, যা আধুনিক ভদ্রসমাজ বনাম আদিম সরলতার এক দারুণ বৈপরীত্য তুলে ধরেছিল। সিনেমার প্রথমদিকে সুধীন্দ্র যখন মনোমোহন মিত্রের এত দেশ ঘোরার কারণ জিজ্ঞেস করেন, তখন তিনি বলেন—”আমি তো মশাই কূপমণ্ডূক হতে চাইনি। ব্যাঙের মতো ওই নিজের কুয়োটাকেই পৃথিবী বলে ভাবা—ওটা আমার দ্বারা হতো না। তাই কুয়ো ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম।” সিনেমার এই দৃশ্যে মনোমোহন ইংরেজি অভিধানের সবচেয়ে বড় শব্দগুলোর একটি উচ্চারণ করে বলেন: “Floccinaucinihilipilification… উনত্রিশটা অক্ষরের এই শব্দের মানে জানেন? অবজ্ঞা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা। যে সভ্যতায় উনত্রিশ অক্ষরের শব্দ দিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য প্রকাশ করতে হয়, সেই সভ্যতার প্রতি আমার কোনো শ্রদ্ধা নেই।” ছবির সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্য ছিল ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় এবং উৎপল দত্তের মধ্যে মুখোমুখি বিতর্ক। প্রীথ্বীশ যখন আদিবাসীদের অসভ্য বা নরখাদক বলে কটাক্ষ করেন, তখন মনোমোহন ক্ষুরধার যুক্তিতে বলেন: “হ্যাঁ, তারা হয়তো তীর-ধনুক দিয়ে মানুষ মারে। কিন্তু বোতাম টিপে এক লপ্তে কয়েক লক্ষ মানুষকে স্রেফ বাষ্প করে উড়িয়ে দেয় না। কে বেশি স্যাভেজ? যারা তীর মারে তারা, নাকি যারা হিরোশিমা-নাগাসাকির ওপর অ্যাটম বোম ফেলেছিল?” ছবির শেষে ধর্ম ও মানুষের আসল পরিচয় তুলে ধরে মনোমোহন বলেন: “আমি মানুষ—এই পরিচয়টাই আমার কাছে মুখ্য। জাতি, ধর্ম, দেশের গণ্ডি এগুলো সব মানুষের তৈরি কৃত্রিম বিভাজন।”