তিন হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস নিয়ে ফিরলেন নোলান, ম্যাট ডেমন ও টম হল্যান্ডের জাদুতে কি মাতল বক্স অফিস?

ক্রিস্টোফার নোলান মানেই এক উৎসব। যখনই তাঁর কোনো নতুন ছবি মুক্তি পায়, তখন ভারতীয় দর্শক থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ‘ইনসেপশন’, ‘ইন্টারস্টেলার’ বা ‘ওপেনহাইমার’-এর মতো জটিল সব সায়েন্স ফিকশন উপহার দেওয়ার পর, এবার নোলান নেমে পড়েছেন তিন হাজার বছরের পুরনো গ্রিক মহাকাব্যিক ইতিহাসে। হোমারের কালজয়ী গল্পের ওপর ভিত্তি করে নোলানের নতুন চলচ্চিত্র ‘দ্য ওডিসি’ এখন প্রেক্ষাগৃহে।

গল্পের প্রেক্ষাপট:
ছবিটি আবর্তিত হয় ইথাকার বীর যোদ্ধা ও রাজা ওডিসিউসকে (ম্যাট ডেমন) কেন্দ্র করে। ট্রয়ের যুদ্ধজয়ের পর ঘরে ফেরার পথেই শুরু হয় বিপত্তি। ভাগ্যের ফেরে ২০ বছর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ওডিসিউসকে মোকাবিলা করতে হয় ভয়ঙ্কর সব সামুদ্রিক দানব ও ডাইনির। ওদিকে ইথাকাতে স্ত্রী পেনেলোপি (অ্যান হ্যাথাওয়ে) এবং ছেলে টেলেমাকাস (টম হল্যান্ড) লড়াই করছে ধূর্ত দখলদারদের বিরুদ্ধে। এই দীর্ঘ ২০ বছরের প্রতীক্ষা এবং ওডিসিউসের ঘরে ফেরার লড়াই নিয়েই ছবির মূল উপজীব্য।

চলচ্চিত্র পর্যালোচনা:
অনেকেই হয়তো ‘ইনসেপশন’ বা ‘টেনেট’-এর মতো জটিল সাসপেন্স খুঁজবেন, কিন্তু এই ছবিতে নোলান দর্শকদের চমকে দেওয়ার চেয়ে গল্পের গভীরতা তুলে ধরার দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। ছবির প্রথম ৪০-৪৫ মিনিট কিছুটা ধীরগতির, যা ভারতীয় দর্শকদের কাছে একঘেয়ে মনে হতে পারে। মাঝে মাঝে মনে হয়, নায়ক আর কতদিন সমুদ্রে ভাসবেন? তবে ছবির দ্বিতীয়ার্ধে যখন নাটকীয় মোড়গুলো আসতে শুরু করে, তখন নোলানের সেই চেনা জাদু আবারও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনো প্রকার বাড়তি ‘মশলা’ ছাড়া সোয়া তিন ঘণ্টার এই দীর্ঘ ছবি অনেকের কাছে কিছুটা ক্লান্তিকর ঠেকতে পারে।

পরিচালনা ও কারিগরি দক্ষতা:
নোলানের মুন্সিয়ানা এখানেই যে, তিনি কৃত্রিম সিজিআই-এর ওপর নির্ভরশীল না থেকে বাস্তবসম্মত সেট ও এফেক্টের ওপর জোর দিয়েছেন। সাইক্লপস বা একচোখা দানবের দৃশ্যগুলো এত জীবন্ত যে গা শিউরে ওঠে। সিনেমাটোগ্রাফার সমুদ্রকে এক বিপজ্জনক প্রান্তর হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা দৃশ্যের গভীরতা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।

অভিনয়:
ম্যাট ডেমন তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয় উপহার দিয়েছেন। ওডিসিউসের ধূর্ততা, বুদ্ধিমত্তা ও মানবিক সীমাবদ্ধতাগুলো তিনি নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে, টম হল্যান্ড নিজেকে মার্ভেল ইউনিভার্সের খোলস থেকে বের করে প্রমাণ করেছেন যে তিনি সিরিয়াস চরিত্রেও অনবদ্য। বাবার ছায়া থেকে বেরিয়ে আসা এক ছেলের ক্রোধ ও যন্ত্রণা তিনি অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

সব মিলিয়ে, আপনি যদি ধীরস্থির এবং মহাকাব্যিক গল্পের ভক্ত হন, তবে ‘দ্য ওডিসি’ আপনাকে হতাশ করবে না। এটি কোনো চটজলদি বিনোদন নয়, বরং নোলানের একটি পরিপক্ক সৃষ্টি। আপনার উইকএন্ডে একটি গভীর সিনেমা দেখতে চাইলে প্রেক্ষাগৃহে অবশ্যই ঢুঁ মারতে পারেন।