“অ্যাক্টিং পারো না, ভীষণ লম্বা, বাড়ি যাও!” বলিউডে পা রাখার আগে কী চরম অপমানের শিকার হয়েছিলেন অমিতাভ?

ভারী গলার স্বরের জন্য অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো থেকে প্রত্যাখ্যান পেয়েছিলেন অমিতাভ বচ্চন—এই তথ্য কমবেশি অনেকেরই জানা। কিন্তু বলিউড শাহেনশার লড়াইয়ের ঝুলি যে এর চেয়েও অনেক বেশি ভারী, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। কেরিয়ারের শুরুর দিনগুলোতে কেবল গলার স্বর বা রেডিওর রিজেকশনই নয়, বরং নিজের অতিরিক্ত উচ্চতার জন্যও চরম কটাক্ষ ও উপহাসের মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। সম্প্রতি ভারতের ক্রীড়া সাফল্য উদযাপনের লক্ষ্যে আয়োজিত কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬-এর স্বর্ণপদক জয়ী লাভলিনা বরগোহাইন, ঝান্ডু কুমার, শর্মিলা ধানকার এবং অস্মিতা দে-র সঙ্গে একটি বিশেষ আলাপচারিতায় নিজের জীবনের সেই কঠিন সংগ্রামের দিনগুলোর কথা অকপটে তুলে ধরেন বিগ বি।

জনপ্রিয় রিয়ালিটি শো ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’-র একটি পর্বে প্রতিযোগী অস্মিতা বচ্চনকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, ক্রীড়াবিদদের প্রশিক্ষণের সময় ভুল করার জন্য প্রায়শই তাঁদের কোচেদের বকাঝকা শুনতে হয়। ঠিক তেমনই সিনেমার সেটে অভিনেতারাও কি পরিচালকদের রাগের মুখে পড়েন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই নস্টালজিক হয়ে পড়েন অমিতাভ। বিনোদন ইন্ডাস্ট্রিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সেই লড়াইয়ের দিনগুলো স্মরণ করে তিনি জানান, শুরুর দিকে তাঁকে প্রতিনিয়ত তীব্র তিরস্কার শুনতে হতো। তাঁর কথায়, “আমি ভীষণ বকা খেতাম। শুরুর দিকে ভীষণই বকা খেতাম। তুমি কিছু পারো না, অভিনয় করতে জানো না, তুমি অনেক লম্বা, ঘরে চলে যাও—এই সব কথা শুনতে হতো।”

এমনকী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যখন তাঁর কাজ পাওয়া শুরু হয়েছিল, তখনও তাঁর লড়াই থামেনি। সেই সময়ের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বিগ বি বলেন, “এরপর যখন ইন্ডাস্ট্রিতে ধীরে ধীরে কাজ পাওয়া শুরু করলাম, তখন অনেক পরিচালক এমন ছিলেন, যাঁরা কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। বলতেন, ‘ওইখানে গিয়ে দাঁড়াও, সংলাপ বলো।’ আবার কখনও আমার সংলাপ ডেলিভারি শুনে বলতেন, ‘এইভাবে কেউ সংলাপ বলে?’ তাঁরা আমাকে বকাঝকা করতেন ও ভুল শুধরে দিতেন এবং এভাবেই ধীরে ধীরে আমার উন্নতি হতে লাগল।” শুধু তাই নয়, কেরিয়ারের শুরুর দিকে শুটিংয়ে সামান্য দেরি হওয়ার কারণে এক পরিচালক তাঁকে প্রকাশ্যে সেট থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি। অমিতাভ বলেন, “সাধারণত আমি শুটিংয়ের জায়গায় সময়মতো পৌঁছানোর চেষ্টা করি। কিন্তু একবার আমার দেরি হয়ে গিয়েছিল। পরিচালক সেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি অন্য একজনের গাড়িতে করে সেখানে গিয়েছিলাম, কারণ তখন আমার নিজের কোনও গাড়ি ছিল না। পৌঁছানোর পর পরিচালক আমাকে দেখে বললেন যে শুটিংয়ের কাজ গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। তিনি আমাকে বললেন, ‘এখান থেকে বেরিয়ে যাও’ এবং চলে যেতে বললেন।”

উল্লেখ্য, দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় বিনোদন জগতের অবিসংবাদিত অংশ হয়ে রয়েছেন অমিতাভ বচ্চন। অভিনয়ে আসার আগে একজন ভয়েস-ওভার শিল্পী হিসেবেই সিনে জগতে তাঁর বর্ণময় যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯৬৯ সালে তিনি মৃণাল সেনের ঐতিহাসিক ছবি ‘ভুবন সোম’-এ তাঁর বলিষ্ঠ ও গম্ভীর কণ্ঠস্বর বা ব্যারিটোন দিয়েছিলেন। স্বল্প বাজেটের এই ছবিটি ভারতের সমান্তরাল চলচ্চিত্র আন্দোলনের ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে ওঠে। প্রায় একই সময়ে অল ইন্ডিয়া রেডিয়োতে (AIR) সংবাদপাঠক পদের জন্য অডিশন দিলেও তাঁর সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বরকে অযোগ্য বলে ঘোষণা করে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর ওই একই বছরে ‘সাত হিন্দুস্তানি’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিনয় জীবন শুরু হলেও দুর্ভাগ্যবশত সেই ছবি বক্স অফিসে বিশেষ সাফল্য পায়নি।

পরবর্তীতে প্রকাশ মেহরার ‘জঞ্জির’-এর মতো কালজয়ী সিনেমার হাত ধরে অমিতাভের কেরিয়ারের মোড় সম্পূর্ণরূপে ঘুরে যায়। এই ছবিই তাঁকে হিন্দি সিনেমার চিরকালের ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’-এর মুকুট পরায়। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। একের পর এক সুপারহিট ও ক্লাসিক সিনেমা উপহার দিয়ে তিনি ভারতীয় দর্শকদের হৃদয়ে পাকাপাকি জায়গা করে নেন। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ‘দিওয়ার’, ‘শোলে’, ‘ডন’, ‘মুকাদ্দার কা সিকান্দার’, ‘ত্রিশূল’, ‘কালা পাথর’, ‘অগ্নিপথ’-এর মতো অসংখ্য মাস্টারপিস। শুধু তাই নয়, সময়ের সঙ্গে নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়ে তুলে পরবর্তী প্রজন্মের সিনেমাতেও সমানভাবে রাজত্ব করেছেন তিনি। তাঁর সমৃদ্ধ ফিল্মোগ্রাফিতে যুক্ত হয়েছে ‘মহব্বতেঁ’, ‘কভি খুশি কভি গম’, ‘ব্ল্যাক’, ‘পা’, ‘পিকু’, ‘পিংক’, ‘১০২ নট আউট’ এবং ‘ঝুন্ড’-এর মতো ভিন্ন স্বাদের ও প্রশংসিত ছবি।