হিন্দিভাষী চালকদের জন্য বড় ধাক্কা! মুম্বইয়ে অটো-ট্যাক্সি চালাতে হলে কি এবার মারাঠি জানতেই হবে?

মুম্বইয়ের রাজপথে অটো ও ট্যাক্সি চালকদের জন্য জীবন জীবিকার সমীকরণ এবার সম্পূর্ণ বদলে যেতে চলেছে। এতদিন পর্যন্ত শুধুমাত্র গাড়ি চালানোর দক্ষতা থাকলেই কমার্শিয়াল ভেহিকল বা বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী গাড়ি চালানোর অনুমতি মিলত, তবে এবার থেকে সেই নিয়ম অতীত। মহারাষ্ট্র সরকার বাণিজ্যিক গাড়ির চালকদের জন্য মারাঠি ভাষার ব্যবহারিক জ্ঞান বাধ্যতামূলক করে একটি নতুন ও কঠোর নির্দেশিকা জারি করেছে। রাজ্য সরকারের পরিবহন মন্ত্রী প্রতাপ সারনাইক স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, যাত্রীদের সঙ্গে সঠিক যোগাযোগ রক্ষা করা এবং জনপরিবহনে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্যই চালকদের সাবলীলভাবে মারাঠি বলতে ও বুঝতে জানতে হবে। ভিনরাজ্য থেকে আসা চালকদের এই ভাষাগত ব্যবধান দূর করতে রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০৫ দিনের একটি বিশেষ মারাঠি শিক্ষা অভিযানও চালানো হয়েছিল, যেখানে ১.৬৫ লক্ষেরও বেশি চালক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।
তবে এই নিয়মের জেরে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়েছেন উত্তরপ্রদেশ, বিহার কিংবা দেশের অন্যান্য প্রান্ত থেকে মুম্বইয়ে এসে অটো ও ট্যাক্সি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক। সংবিধানের ১৯(১)(জি) ধারা অনুযায়ী দেশের যে কোনো নাগরিকের নিজের পছন্দমতো পেশা বা ব্যবসা বেছে নেওয়ার মৌলিক অধিকার থাকলেও, জনস্বার্থ এবং নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে রাজ্য সরকার নির্দিষ্ট কিছু পেশার জন্য বিধিমালা প্রণয়ন করতে পারে। মহারাষ্ট্র সরকারের মূল যুক্তি হলো, মুম্বইয়ে কাজের খোঁজে আসা মানুষদের স্বাগত জানালেও স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতিকে সম্মান জানানো প্রত্যেক চালকের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ যাত্রীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে সামান্য ভাষাগত সমস্যাও অনেক সময় বড় ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ভাষা না জানার কারণে হুট করে কোনো চালকের লাইসেন্স বা পারমিট সরাসরি বাতিল করা হবে না। বরং প্রথমে সংশ্লিষ্ট চালককে এক মাসের একটি আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হবে এবং ভাষাটি আয়ত্ত করার পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হবে। নির্দিষ্ট সময়ের পরেও যদি কেউ নিয়ম না মানেন, তবে প্রথমে তিন মাসের জন্য লাইসেন্স বা ব্যাজ স্থগিত করা হতে পারে এবং পরবর্তীতে বারবার নিয়ম লঙ্ঘন করলে পারমিট পুরোপুরি বাতিল করার কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশেষ করে, ২০২৬ সালের ২০ আগস্ট থেকে নতুন অটো-ট্যাক্সি ব্যাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে মারাঠি ভাষার দক্ষতা যাচাইয়ের পরীক্ষা এবং তার ভিডিও রেকর্ডিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
এই আইনি জটিলতা নিয়ে আইনি মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ২০১৭ সালে বোম্বে হাইকোর্ট শুধুমাত্র একটি সরকারি সার্কুলারের ভিত্তিতে অটো পারমিটে মারাঠি ভাষাকে বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ খারিজ করে দিয়েছিল। তবে বর্তমান রাজ্য সরকার এবার আর সাধারণ সার্কুলারের পথে না হেঁটে সরাসরি ‘মহারাষ্ট্র মোটর যানবাহন বিধিমালা, ১৯৮৯’-এর ৪, ২২, ৭৮ এবং ৮৫ নং বিধি সংশোধন করে এই ভাষাগত শর্তটিকে আইনি বৈধতা দিয়েছে। ফলস্বরূপ, বর্তমান পরিস্থিতির আইনি প্রেক্ষাপট আগের চেয়ে অনেক বেশি মজবুত। আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিকদের অধিকার বনাম স্থানীয় ভাষার মর্যাদার এই দ্বন্দ্বে আগামী দিনে মহারাষ্ট্রের গণপরিবহন ব্যবস্থা কোন মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।