২৫টি মন্ত্রকই ‘ভুয়া’! শাহবাজ সরকারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক রিপোর্ট সামনে আসতেই নড়েচড়ে বসল পাকিস্তান

পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে এক বিরাট ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের সেনেট কমিটি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের প্রায় ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক ও বিভাগকে সম্পূর্ণ ‘জালিয়াতিপূর্ণ’ ও অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে। শুধু তাই নয়, অবিলম্বে এই সমস্ত ভুয়া মন্ত্রকগুলি চিরতরে বিলুপ্ত করার জন্য সরকারের কাছে জোরদার সুপারিশ করেছে ওই সংসদীয় কমিটি। সেনেটের এই চাঞ্চল্যকর ঘোষণার ফলে গোটা দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক শোরগোল শুরু হয়েছে।
ডন পত্রিকার সূত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেনেট কমিটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে বর্তমান সরকার ১৯৭৩ সালে প্রণীত পাকিস্তানের মূল সংবিধানের নিয়মনীতিকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক নতুন মন্ত্রক গঠন করেছে। আর এই বেআইনি সিদ্ধান্ত সরাসরি দেশের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যগুলির সাংবিধানিক অধিকারের ওপর একটি চরম ও অবৈধ হস্তক্ষেপের সামিল। কমিটি আরও জানিয়েছে যে, এই জাল ও অতিরিক্ত মন্ত্রকগুলির পরিচালনার খেসারত হিসেবে দেশের কোষাগার থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার জলে যাচ্ছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকা এই অপ্রয়োজনীয় মন্ত্রকগুলির পিছনে জলের মতো অপচয় করা হচ্ছে।
যে সমস্ত প্রধান মন্ত্রক ও বিভাগগুলিকে অবিলম্বে বিলুপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রেল, পেট্রোলিয়াম, জলসম্পদ, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জনকল্যাণমূলক খাতগুলিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সেনেট কমিটির কড়া নির্দেশ, এই জাল বিভাগগুলির দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিকদের অবিলম্বে তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করতে হবে। সংবিধানের ১২৪ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রেলপথ, পেট্রোলিয়াম এবং জলের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের যৌথ বা মিশ্র তালিকার অন্তর্ভুক্ত। তাই কেন্দ্রীয় সরকার এককভাবে বা একতরফাভাবে এই সমস্ত বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এই ধরনের বিরোধ ও প্রশাসনিক জটিলতা মেটানোর জন্য দেশটিতে একটি ‘সম্মিলিত স্বার্থ পরিষদ’ গঠিত রয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও চারজন প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এবং তিনজন মন্ত্রিসভার সদস্যের থাকার কথা।
এছাড়াও, পাকিস্তানের ফেডারেল আইন প্রণয়ন তালিকার প্রথম অংশে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, কেন্দ্রীয় সরকার সর্বোচ্চ কেবল নয়টি নির্দিষ্ট বিভাগ সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং বাকি সমস্ত ক্ষমতা রাজ্যগুলির হাতে ন্যস্ত থাকবে। বর্তমানে যে নয়টি বিভাগের ওপর কেন্দ্রের একচ্ছত্র অধিকার রয়েছে, সেগুলি হলো—প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, অর্থ, বাণিজ্য, যোগাযোগ, সামুদ্রিক বিষয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, আইন ও বিচার এবং সংসদীয় বিষয়। অথচ এই সাংবিধানিক সীমানা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত মন্ত্রক তৈরি করা হয়েছে। এমনিতেই খাইবার পাখতুনখোয়া থেকে শুরু করে বেলুচিস্তান এবং পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর পর্যন্ত গোটা পাকিস্তানজুড়ে চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। স্বয়ং পাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে স্বীকার করেছেন যে দেশের পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। একদিকে আকাশছোঁয়া পেট্রোলের দাম এবং অন্যদিকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক পরিকাঠামোর চরম বেহাল দশায় সাধারণ নাগরিকরা দিশাহারা। এর ওপর সিন্ধু ও পাঞ্জাবের মতো প্রভাবশালী রাজ্যগুলিও জলবণ্টন নিয়ে বড়সড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় সেনেটের এই বিস্ফোরণমূলক রিপোর্ট শাহবাজ সরকারকে আরও গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।