জলের সংকট এড়াতে বিপ্লব! আধুনিক ড্রিপ ইরিগেশনে মিলছে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি

কৃষিক্ষেত্রে সেচের জন্য জলের প্রাপ্যতা একটি ক্রমবর্ধমান এবং গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। এই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির অন্যতম আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ড্রিপ সেচ (Drip Irrigation) বা বিন্দু সেচ পদ্ধতি। এই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষকরা যেমন একদিকে বিপুল পরিমাণ জল সাশ্রয় করতে পারছেন, তেমনই অন্যদিকে ফসলের সঠিক পুষ্টি ও চাহিদা পূরণ করে উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছেন। ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে জমিতে জল ভাসিয়ে দেওয়ার যে নিয়ম রয়েছে, তাতে জলের অপচয় হয় প্রচুর। কিন্তু ড্রিপ পদ্ধতিতে জল সরাসরি গাছের শিকড়ে পৌঁছে দেওয়া হয়, ফলে এক ফোঁটা জলও নষ্ট হয় না।

ওয়াটার ইনস্টিটিউটের সিআরপি বিশেষজ্ঞ গুঞ্জন শুক্লার মতে, এই পদ্ধতিটিকে অনেক সময় ‘ট্রিকল ইরিগেশন’ (Trickle Irrigation) বা ফোঁটায় সেচ নামেও ডাকা হয়। এতে পাইপলাইনের একটি সুবিন্যস্ত জালের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত মাপে জমিতে জল সরবরাহ করা হয় এবং ছোট ছোট ড্রিপারের সাহায্যে তা সরাসরি গাছের গোড়ায় বা শিকড়ে গিয়ে পৌঁছায়। এর ফলে গাছ তার প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা নিখুঁতভাবে পায় এবং অতিরিক্ত জল জমে গিয়ে গাছ পচে যাওয়ার বা মাটি নষ্ট হওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকে না। শাকসবজি ও ফলমূল চাষের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত ফলদায়ী প্রমাণিত হয়েছে। আখ, কলা, পেঁপে, টমেটো এবং লঙ্কার মতো লাভজনক ফসলে এই ড্রিপ সিস্টেম ব্যবহার করে কৃষকরা অভাবনীয় সাফল্য পাচ্ছেন। জমির আকার ও গাছের মধ্যকার সুনির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে এই সিস্টেম স্থাপন করা হয়, যা প্রতিটি গাছকে সমানভাবে পুষ্টি জোগাতে সাহায্য করে।

ড্রিপ সেচের সবচেয়ে বড় এবং উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো জল সাশ্রয়। প্রথাগত সেচ ব্যবস্থায় যেখানে জমির একটি বিশাল অংশে জল ছড়িয়ে পড়ে এবং বাষ্পীভূত হয়ে যায়, সেখানে ড্রিপ পদ্ধতিতে সীমিত পরিমাণে জল সরাসরি উদ্ভিদের মূলে নিবদ্ধ থাকে। এর ফলে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পানি সাশ্রয় করা সম্ভব হয়, যা দেশের জল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ। প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত ও মাপা সেচ দেওয়ার ফলে গাছের বৃদ্ধি অত্যন্ত দ্রুত ও স্বাস্থ্যকর হয়। এর পাশাপাশি, এই পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘ফার্টিগেশন’ (Fertigation) নামক একটি বিশেষ প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে পানিতে দ্রবণীয় প্রয়োজনীয় সার সরাসরি সেচের জলের সাথে মিশিয়ে গাছের শিকড়ে পৌঁছে দেওয়া হয়। ফলে জমির অন্যান্য অংশে সার ছড়ানোর অপচয় রোধ হয় এবং মাটির উর্বরতা দীর্ঘদিন বজায় থাকে।

এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলো বিভিন্ন আকর্ষণীয় ভর্তুকি বা অনুদান প্রকল্প চালু করেছে। গুঞ্জন শুক্লা জানিয়েছেন যে, যোগ্য কৃষকরা ড্রিপ সেচ ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে সরকারি প্রকল্পের আওতায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত আর্থিক অনুদান পেতে পারেন। তবে এই ভর্তুকির প্রকৃত পরিমাণ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট রাজ্য, প্রকল্পের নির্দিষ্ট নিয়ম এবং কৃষকের যোগ্যতার ওপর। যেসব কৃষক ভাই ও বোনেরা নিজেদের জমিতে ড্রিপ সেচ ব্যবস্থা স্থাপন করতে ইচ্ছুক, তারা দেরি না করে নিজ জেলার উদ্যানপালন বা কৃষি বিভাগের কার্যালয়ে যোগাযোগ করে বিস্তারিত তথ্য জেনে নিতে পারেন। এছাড়া, নিকটস্থ কমন সার্ভিস সেন্টার (CSC)-এ গিয়ে জমির দলিল, ব্যাংক পাসবুক, আধার কার্ড এবং কৃষক নিবন্ধনের প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়ে খুব সহজেই অনলাইনে আবেদন করা সম্ভব। জল বাঁচান, খরচ কমান এবং আধুনিক প্রযুক্তির হাত ধরে কৃষিকে আরও লাভজনক ও টেকসই করে তুলুন—এটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।