“জলের গভীরে মুক্তির খোঁজ!”-ভাইয়ের মতো তিন বোনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভেসে থাকেন পুকুরে

মুম্বইয়ের আলোচিত ইকবাল হোসেনের ঘটনা তো বটেই, এবার তার মতোই এক চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক বাস্তব চিত্র প্রকাশ্যে এল মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার বড়ুয়ার ফরাজিপাড়া গ্রাম থেকে। ইকবালের মতো তাঁর জেঠতুতো দিদি ও বোনেরাও একই রকম শারীরিক যন্ত্রণার শিকার। শরীরের জ্বালাপোড়া থেকে সাময়িক রেহাই পেতে তাঁরাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুকুরের ঠান্ডা জলে ভেসে থাকেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ইকবালের মতো মুম্বইয়ে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ কি এই তিন বোনের ভাগ্যে জুটবে না? অর্থাভাবে জর্জরিত ও তিন মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন অসহায় মা গুলশন বেওয়া।

মৃত মুরসালিম ও গুলশনের তিন মেয়ে—তৌফিকা পারভিন, নাসরিন সুলতানা এবং তানিয়া সুলতানা—বর্তমানে চরম শারীরিক ও মানসিক সংকটের মুখোমুখি। গুলশন জানান, ছোটবেলায় তিন মেয়ে স্বাভাবিক থাকলেও বয়স দশ-বারো বছর পেরোতেই তাদের মধ্যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ধীরে ধীরে তাদের শরীরের ওজন বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং বর্তমানে তিন বোনেরই ওজন একশো কিলোগ্রাম ছাড়িয়ে গিয়েছে। সারা শরীর তীব্র জ্বালা করায় তারা সারাদিন পুকুরের জলে পড়ে থাকে। শীত-গ্রীষ্ম নির্বিশেষে অন্ধকার না নামা পর্যন্ত জল থেকে ওঠে না তারা। অন্য সময়েও দিনে অসংখ্যবার স্নান করতে বাধ্য হয় এবং কেবল ফ্রিজের ঠান্ডা জল পান করে। এই অস্বাভাবিক জীবনযাপনের ফলে তারা দীর্ঘদিনের শ্বাসকষ্টের রোগী হয়ে পড়েছে। অনেক সময় অবস্থার অবনতি হলে বেলডাঙা ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে ইঞ্জেকশন ও অক্সিজেন দিয়ে তাদের যন্ত্রণা কমাতে হয়।

অসুস্থতার কারণে এই তিন মেয়ের পড়াশোনাও বেশিদূর এগোয়নি। বড় মেয়ে তৌফিকা মাধ্যমিক পর্যন্ত গিয়ে পড়া ছাড়েন, মেজ মেয়ে নাসরিন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এবং ছোট মেয়ে তানিয়া ক্লাস টুতেই পড়াশোনা বন্ধ করে দেন। ঘরের কোনো কাজ তো দূরের কথা, নিজেরা ঠিকমতো চলাফেরা করতেও পারেন না তৌফিকারা। কাকিমা নাসিমা খাতুন জানান, রাতের অন্ধকারেও পুকুরে চলে যাওয়ার জেদ ধরায় বাধ্য হয়ে বাড়ির বারান্দায় লোহার গ্রিল ও তালা লাগিয়ে রাখতে হয়।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ইকবাল ও তৌফিকাদের দাদু মুস্তাফা শেখের ওজনও একসময়ে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। মুস্তাফার দুই ছেলে মুরসালিম ও হাসিবুলের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা দেখা যায় এবং তিন জনেই মধুমেহ রোগে ভুগে অকালমৃত্যুর শিকার হন। চিকিৎসকদের একাংশের মতে, এটি একটি জটিল জিনগত বা বংশগত রোগ হতে পারে। অন্যদিকে, বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রঞ্জন ভট্টাচার্য মনে করেন, অতিরিক্ত স্থূলতার কারণে সৃষ্ট ‘বডি শেমিং’ এবং গভীর মানসিক অবসাদ থেকে ‘সোমাটোফর্ম ডিসঅর্ডার’ তৈরি হতে পারে। শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতেই তারা জলের মধ্যে আশ্রয় খোঁজে। দীর্ঘদিন জল ও ঠান্ডায় থাকার ফলে চর্মরোগ এবং মানসিক সমস্যা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ অনাদি রায়চৌধুরী জানিয়েছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা না গেলেও হাসপাতালে নিয়ে এলে তাদের যথাযথ চিকিৎসা করা সম্ভব। তবে অভাবের তাড়নায় এবং সঠিক চিকিৎসার অভাবে ধুঁকতে থাকা এই তিন বোনের জীবনে কবে স্বাভাবিক আলো ফিরবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।